কিম জং ন্যাম হত্যায় কেন এই বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহৃত হলো?

news_picture_43478_kim


সময়ের কণ্ঠস্বর, নিউজ ডেস্কঃ

উত্তর কোরিয়ান নেতা কিম জং উনের সৎভাই কিম জং ন্যামকে হত্যার জন্য কুয়ালালামপুরের বিমানবন্দরে ঘাতকরা বিষ হিসেবে ব্যবহার করেছিল ভিএক্স নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ। কিন্তু কেন?

খুব কম লোকই এর কারণ জানেন। কিন্তু তারা কোন কথা বলছেন না। যে মহিলাটি কিম জং ন্যামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মুখে ওই তৈলাক্ত পদার্থটি মাখিয়ে দিয়েছিল, সম্ভবত সে-ও জানতো না সে কি করছে। জিনিসটা কি – তাও হয়তো তার জানা ছিল না।

স্টিফেন ইভান্স জানাচ্ছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন জোর জল্পনা চলছে – কেন হত্যাকান্ডে এই জিনিসটি ব্যবহৃত হলো?

উত্তর কোরিয়ার হাতে যে পরমাণু বোমা ছাড়া অন্য আরো গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে – তা জানান দিতে? নাকি প্রকাশ্য জায়গায় নি:শব্দে একজন লোককে মেরে ফেলার কার্যকর উপায় হিসেবে?

ভিএক্স জিনিসটা এতই বিষাক্ত যে, আক্রান্ত হবার মাত্র ১০-১২ মিনিটের মধ্যেই কিম জং ন্যাম মারা যান।

এটা একটার তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী নার্ভ এজেন্ট। এক গ্রামের একশ ভাগের এক ভাগও – অর্থাৎ ভিএক্স-এর একটি খুব ছোট্ট ফোঁটাও মানুষের চামড়ার ওপর পড়লে তা কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু ঘটাতে পারে।

কারণ, এই রাসায়নিক পদার্থটি চামড়া ভেদ করে শরীরে ঢুকে যায় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে।

ফলে বুকে ব্যথা, কাশি, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, অবসন্নতা এবং শেষ পর্যন্ত সংজ্ঞা হারানো – এসব লক্ষণ দেখা দেয় কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

প্রশ্ন হচ্ছে – যে মহিলা এই ভিএক্স আক্রমণ চালিয়েছিল, তারও তো তাহলে মারা যাবার কথা। কিন্তু সে বমি করেছে বলে খবর পাওয়া যায়, কিন্তু মারা যায় নি।

তার মানে, হয়তো এমন ভাবে আক্রমণটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে কিম জং নামের মুখে ভিএক্স লাগিয়ে দেয়ার সময় আক্রমণকারী নিজে তার সংস্পর্শে না আসে। হয়ত এ জন্য তাদের বিশেষভাবে মহড়া দিতেও হয়েছিল।

একটি হত্যাকান্ডের জন্য এত কম পরিমাণ ভিএক্স দরকার যা খুব সহজেই লুকিয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসা সম্ভব। এটাও হয়তো ছিল একটা বড় সুবিধা।

অনেকে বলেছেন, হয়তো পরিকল্পনাকারীরা ভেবেছিল ভিএক্স দিয়ে হত্যা করা হলে তা ময়না তদন্ত ছাড়া ধরা পড়বে না, এটা একটা ‘আকস্মিক কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলেই মনে হবে।

মনে রাখা দরকার – উত্তর কোরিয়া চেয়েছিল, ময়নাতদন্ত ছাড়াই যেন মালয়েশিয়া মৃতদেহটি পিয়ংইয়ং-এর হাতে তুলে দেয়। কিন্তু মালয়েশিয়া তাতে কিছুতেই রাজি হয় নি – যা নিয়ে পরে দুদেশের কূটনৈতিক বিবাদও তৈরি হয়।

উল্লেখ্য, রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে গুপ্তহত্যার ঘটনা নতুন নয়।

এর আগে ২০০৬ লন্ডনে আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকো নামে একজন পলাতক রাশিয়ান স্পাই তেজষ্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে জানা যায় তিনি দুজন সাবেক কেজিবি এজেন্টের সাথে একটি হোটেলে বসে যে চা খেয়েছিলেন – তাতে তেজষ্ক্রিয় পদার্থ মেশানো ছিল।

১৯৭৮ সালে লন্ডেই গ্রেগরি মারকভ নামে বিবিসির একজন প্রযোজককে এমনভাবে বিষভর্তি ‌ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয় – যে কেউ কিছু বোঝার আগেই হত্যাকারী ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। মনে করা হয়, এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল বুলগেরিয়ান এজেন্টরা।

ডংগুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কো ইউ-হোয়ান বলছেন, তার মনে হয় বিষপ্রয়োগে হত্যার সুবিধাগুলোর কথা চিন্তা করেই সম্ভবত ‘উত্তর কোরিয়া বা তার নেতা কিম জং উনের ইচ্ছায়’ এই হত্যাকান্ডে ভিএক্স ব্যবহারের বিকল্পটি বেছে নেয়া হয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এ হত্যাকান্ডের পরে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে – বিশেষ করে সেখানে অবস্থানরত উত্তর কোরিয়ান ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে।

অনেকেই প্রকাশ্যে চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছেন। কারণ হঠাৎ পথের ওপর কেউ যদি কারো মুখে ভিএক্স মাখিয়ে দেয় – সম্ভবত দেহরক্ষী রেখেও তা ঠেকানো যাবে না।-সূত্র: বিবিসি বাংলা