ধামরাইয়ের ইটভাটায় প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে ৩০টন উর্বর মাটি

df


আনোয়ার হোসেন রানা,স্টাফ রিপোর্টারঃ

ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দেদারসে আবাদি জমির টপসয়েল (জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি) ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে। আর এসব বৈধ-অবৈধ ইটভাটায় প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে প্রায় ৩০ টন উর্বর মাটি।এতে যেমন আবাদি জমির উর্বরা শক্তি কমে যাচ্ছে এতে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন। তার পরও ইটভাটার গর্ভে যাচ্ছে ফসলি জমির জমির উপরিভাগ ছয় থেকে আট ইঞ্চি উর্বর মাটি। অপর দিকে ফসলি জমির টপসয়েল বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রামে সংর্ঘষের ঘটনাও ঘটেইচলছে।

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ধামরাই উপজেলায় ফসলি জমিতে শতাধিক বৈধ-অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে।এসব ইটভাটা মালিকদের চাপে বাধ্য হয়ে জমির মালিকরা সামান্য টাকার বিনিময়ে জমির জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি(টপসয়েল )বিক্রি করে দিচ্ছে। এভাবে মাটির উপরের স্তর কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা যেভাবে কমছে তাতে কৃষিবিদরা আশঙ্কা করছেন ফসল উৎপাদনের অধেক মাত্রা হ্রাস পাবে।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দুই শতাাধিক ভেকু মেশিন দিয়ে জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। ধামরাইয়ের জয়পুরা, কালামপুর, ডাউটিয়া, সুতিপাড়া, বড়াটিয়া, নান্নার, শ্রীরামপুর, বেলিশ্বর এলাকায় ভেকু মেশিন দিয়ে ফসলি জমি থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক মাটি ইটভাটাগুলোতে যাচ্ছে। ট্রাক শ্রমিকরা জানান,দেড় মাস ধরে তারা এসব স্থানে মাটি কাটছেন। প্রতিদিনই মাটি কাটা হয়। যেসব জমি থেকে শ্রমিকরা মাটি কাটছেন,সেসব জমি আবাদি। সেখানে চাষ করা ভুট্টো ও বোরো ধান হয়েছে। উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ আবাসিক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন জমিতে ও মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের পাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ইটভাটা। আর এসব সড়কের পাশেই ইট তৈরি করার জন্য স্তূপাকারে মজুদ করা হয়েছে মাটি।

স্থানীয়রা জানায়,অধিকাংশ ইটভাটার মালিক প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধি হওয়ায় আবাদি কৃষি জমির উপর লোকালয়ে,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ইটভাটায় ইট পোড়ানো হলেও প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।আবার গোপনে মৌখিকভাবে প্রশাসনকে জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেয় না। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান সিকদার জানান,ধামরাইয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৬৫টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় ৬৬৬ হেক্টর জমি লেগেছে। গত বছর ৬১৫ হেক্টার জমিতে ছিল ইটভাটা। এ বছর ৫০ হেক্টর নতুন জমিতে অর্থাৎ  ফসলি জমিতে নতুন ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে। এ বছর ৩৩৪ হেক্টর আবাদি কৃষি জমির টপসয়েল নিয়ে গেছে এসব ইটভাটায়। এসব ইটভাটার অধিকাংশ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স নেই।

ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ জানান,সারা উপজেলায় ১৬৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ কাগজ রয়েছে ৭০টি ইটভাটার। প্রতিটি ভাটায় জমি লেগেছে গড়ে ৩৫ বিঘা।এ ছাড়া ইটভাটার মালিক ফটোমিয়া জানান,প্রতিবছর গড়ে প্রতিটি ইটভাটায় ন্যুনতম ৬০ লাখ ইট প্রস্তুত করা হয়।প্রতিটি ইটের ওজন প্রায় তিন কেজি। এতে দেখা যায়,১৬৫টি ইটভাটায় প্রতিবছর ৯৯ কোটি ইট তৈরি করা হয়।প্রতিটি ইটের ওজন তিন কেজি হলে ২৯৭ কোটি কেজি মাটি লাগছে ৯৯ কোটি ইট প্রস্তুত করতে। প্রতিবছর ২৯ লাখ ৭০ হাজার টন মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। যা গ্রামের সাধারণ কৃষকদের আবাদি কৃষি জমি থেকে মাটি নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এতে দিন দিন কমে আসছে আবাদি জমি। আবাদি জমির ফসলসহ কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি। আগামী পাঁচ বছর পর ধামরাই উপজেলায় খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান সিকদার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,সরকারের ইটভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন,২০১৩ অনুযায়ী নিষিদ্ধ এলাকা (বিশেষ করে আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা,পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, কৃষি আবাদি জমি,বন ও বাগানকে বোঝানো হয়েছে)থেকে অন্তত এক কিলোমিটার ও এলজিইডি নির্মিত সড়কের আধা কিলোমিটারের মধ্যে কোনও ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

বিদ্যমান আইনে আবাসিক ও কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে আর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রাখলে এক বছর কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।তবে সরকারের এসব আইনের কোনও তোয়াক্কা করা হয়নি এসব ভাটা স্থাপনে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন,যেসব ইটভাটার বৈধ কাগজপত্র নেই ওই সব ইটভাটায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।