প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর চূড়ান্ত

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক – ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর চূড়ান্ত হয়। তিনি আসছেন এপ্রিলের প্রথম দিকে। তবে এখনও দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। কেন হয়নি, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন মত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর এর আগে দু-দু’বার চূড়ান্ত হবার পরও পিছিয়ে দেওয়া হয় অজ্ঞাত কারণে। ভারতের বিদেশ সচিব জয়শঙ্কর বেজিং থেকে ফেরার পথে এবার ঢাকায় গিয়ে শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর, হাসিনার দিল্লি সফর চূড়ান্ত করা হয়। তবে দু’দেশের তরফেই এখনও পর্যন্ত দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়নি।

এর আগে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতে আসার কথা ছিল হাসিনার। সেই তারিখ পিছিয়ে দিয়ে ঠিক হয় যে, তিনি এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাও পিছিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, কেন বার বার এমনটা হচ্ছে? কেন এই দোলাচল? এতে করে কী বার্তা দিতে চাইছে ঢাকা?

প্রধানমন্ত্রী মোদী ২০১৫ সালে ঢাকা সফরে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, তার মধ্যে স্থলসীমা চুক্তি ও ছিটমহল বিনিময় ছাড়া বাংলাদেশের কাছে যেটা এই মুহূর্তে সবথেকে জরুরি, সেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে একফোঁটা পানিও গড়ায়নি। অথচ আগামী বছরের শেষে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। শেখ হাসিনার দুশ্চিন্তা তাই তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে। গরমকালে চাষের পানি না পেলে হাসিনার বিরুদ্ধে বিরোধি দলের আক্রমণ তীব্র হবে। সেটা মোদী সরকার বুঝতে না পারায় হাসিনা সরকার স্বভাবতই অসন্তুষ্ট।

আসলে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর চূড়ান্ত হবার পর অনিবার্য কারণ ছাড়া সাধারণত বদলায় না। তাই কূটনৈতিক মহল থেকে বলা হচ্ছে, প্রথমবার এ সফর পিছিয়ে দেবার কারণ সম্ভবত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত করার অনূকুল বাতাবরণ না থাকা। কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার, অর্থাৎ মোদী-মমতা সংঘাত বিমুদ্রাকরণসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে ছিল তুঙ্গে। তিস্তা চুক্তির অন্যতম অংশীদার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুমোদন জরুরি। দ্বিতীয়বার, অর্থাৎ এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসিনার সফর পিছিয়ে যায় সম্ভবত ভারতের পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের কারণে। বলা হয়, সে সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ব্যস্ত ছিলেন নির্বাচনি প্রচারে।

pm-hasina-modi

আর এবারও সফর চূড়ান্ত করার পর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা না করাকে নিয়ে একটা ধন্দ সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের সবথেকে কাছের, সবথেকে বিশ্বস্ত প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর বার বার দিল্লি সফর বাতিল করাটা কি ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা? নাকি চীনকে সামনে রেখে ঢাকা চাপ সৃষ্টি করতে চায় দিল্লির ওপর?

এ প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ত্রিদিব চক্রবর্তী আলাপচারিতায় যা বললেন, তার মর্মার্থ হলো, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সবথেকে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কোয়ালিশন রাজনীতি। যার অর্থ, আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান এবং শক্তি বৃদ্ধি। তিস্তা চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের মতো এক সময় শ্রীলংকা নীতি নিয়ে জোট সরকারের শরিক হয়েও তামিলনাড়ুর ডিএমকে দল কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তাই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যগুলির সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে রাজ্যস্তরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগের কথা ভাবছেন। কেন্দ্রে মোদী সরকারের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে ঠিকই, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত রাজ্যের ওপর জোর করে চাপাতে গেলে তা হিতে বিপরীত হবে বলে মনে করছেন তিনি।

এছাড়া তিস্তার জলের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফরমুলা উঠে এসেছে। কখনও ৪০-৩০ অনুপাত, কখনও ৬০-৪০ অনুপাত আবার কখনও ৫০-৫০ অনুপাত। এক দেশ বেশি জল টানলে অন্য দেশের চাষের জলে টান পড়বে। যেমন, ব্রহ্মপুত্র নদে চীন বাঁধ দেওয়ায় মনিপুরের তিয়াং নদী গেছে শুকিয়ে। কাজেই রাজ্যগুলির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসা জরুরি, যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। কথাটা এভাবেই বলেন অধ্যাপক চক্রবর্তী।

চীন ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা গভীরতর করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। তাই কি বাংলাদেশ চীনকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে? কূটনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় দর কষাকষির হাতিয়ার?

এর উত্তরে ত্রিদিব চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ একটি বিকাশমুখী দেশ। চীন বা অন্য দেশের কাছে সে সহযোগিতা চাইতেই পারে। যেমন, চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন বা সামরিক উপকরণ সংগ্রহে চীনের সহযোগিতা চাইতেই পারে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ভারতের বিবেচ্য সেটাকে ‘ব্যালেন্স’ করতে পারা।’’

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক চক্রবর্তীর মতে, অত্যধিক চীন নির্ভরশীলতা অন্যান্য দেশের পক্ষে খুব সুখকর হয়নি। ঢাকা যদি বেজিংকে দিল্লির বিরুদ্ধে তুরুপের তাস করতে চায়, তাহলে সেটা ভুল কাজ হবে। লাভের বদলে এতে লোকসান হবে বেশি, অন্ততপক্ষে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমির নিরিখে। উল্লেখ্য, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ঢাকা সফরে দু’দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন। সম্পাদিত হয় আড়াই হাজার কোটি ডলারের অন্তত ২৭টি সমঝোতাপত্র।

আশার কথা, বর্তমানে ঢাকা তিস্তার জলবণ্টন চুক্তিকে একমাত্র বিষয় বলে মনে করছে না। ভারত থেকে বয়ে আসা সব নদীর জলের ন্যায্যভাগই বাংলাদেশের কাম্য। দু’দেশের সম্পর্ক স্রেফ জলের ইস্যুতেই যেন আটকে না থাকে। ঢাকার এই নতুন অবস্থানকে ইতিবাচক বলেই মনে করছে দিল্লি। আর শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে তার ছাপ পড়বে বলেই ধারণা কূটনৈতিক মহলের।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের নৌ ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর জন্য জলযান, সামরিক উপকরণ এবং ট্রেনিং দিয়ে সাহায্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ভারতের তরফ থেকে। এ বিষয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর সম্প্রতি ঢাকা সফরে গিয়ে বাংলাদেশ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা সেরে এসেছেন।