জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি শক্তিমান অভিনেতা ‘গোলাম মুস্তাফা’কে

বিনোদন প্রতিবেদক, সময়ের কণ্ঠস্বর . সব্যসাচী প্রতিভার অধিকারী, আমাদের দেশের বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী, শক্তিমান অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা। বেতার, টিভি, মঞ্চ, চলচ্চিত্র এই চার মাধ্যমেই তিনি তার সুঅভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। দোর্দান্ড প্রতাপে অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্রে। আজ এই মানুষটির জন্মদিন , ২ মার্চ। বেঁচে থাকলে এবারে তিনি ৮৩ বছরে পা রাখতেন।জন্মদিনে তাঁকে স্মরন করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

বরিশালের পিরোজপুরে ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই অভিনেতা। তার বাবা ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার। গোলাম মুস্তাফার স্কুলজীবন শুরু হয় পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। ম্যাট্রিক পাস করেন খুলনা জিলা স্কুল থেকে। স্কুল-কলেজ জীবনে নাটকে অভিনয় করা তার শখ ছিল। ঢাকায় আসেন পঞ্চাশের দশকের মধ্য সময়ে। সেই থেকে তিনি ঢাকায় স্থায়ী হয়ে গেলেন। হঠাৎ করে বেতারের অভিনেত্রী হোসনে আরার সঙ্গে তার পরিচয় হলো। একজন আরেকজনকে ভালোবেসে ১৯৫৮ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

গোলাম মুস্তাফা ১৯৫৯ সালে মুস্তাফিজের ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পান। ওই ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন রহমান ও চিত্রা সিনহা। ঢাকার প্রথম নায়ক ও পরিচালক আবদুল জব্বার খান তার ‘নাচঘর’ ছবিতে প্রথম নায়ক হিসেবে কাস্ট করলেন। নায়ক হিসেবে তার দ্বিতীয় ছবি ‘বন্ধন’ মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালে। নায়িকা ছিলেন চিত্রা সিনহা। এরপর ‘কাজল’ ছবিতে শবনমের বিপরীতে দুই নায়ক খলিল ও মুস্তাফা। উর্দু ভাষায় নির্মিত ‘কাজল’ ছবিটি ব্যবসা সফল হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে নির্মিত হলো ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’। এ ছবিতে মুস্তাফার ডাবল রোল ছিল। তার দুই নায়িকা রেশমা আর ফরিদা মির্জা। ছবির শুটিং ঢাকাতে হয়েছিল। নায়ক হিসেবে এসএম পারভেজ পরিচালিত ‘বেগানা’ তার ৫ম ছবি। ১৯৬৭ সালে ‘চাওয়া পাওয়া’ ছবিতে মুস্তাফা আবার রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সুচন্দার বিপরীতে অভিনয় করলেন। এর পরে ‘দাসী’ এবং ‘সোহানা সফর’ ছবি দুটিতে তিনি নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। ‘সোহানা সফর’ ছবিতে তার নায়িকা ছিল রওশন আরা কিন্তু এ ছবিটি পরে রিলিজ হলো না।

ami

গোলাম মুস্তাফা বাংলা ও উর্দু মিলে প্রায় তিনশ চলচ্চিত্রে নায়ক, সহনায়ক, খলনায়ক সহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন।

তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে- রাজধানীর বুকে , হারানো দিন , চাকা, নাচঘর, কাজল, বন্ধন, ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো, বেগানা, চাওয়া পাওয়া, দাসী, দুই রাজকুমার, বলাকা মন, হিসাব নিকাশ, শুভদা, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, পীরিত না জানে রীত, চোখাই, তালাশ, আলিবাবার চল্লিশ চোর, নিজেকে হারায়ে খুজি, রক্তাক্ত বাংলা, তিতাস একটি নদীর নাম, সূর্যসংগ্রাম, দোষী, শ্লোগান, অন্যায় অবিচার, ব্যথার দান, সুরুজ মিয়া, সীমানা পেড়িয়ে, সারেং বউ, পদ্মা নদীর মাঝি, চন্দ্রনাথ, দেবদাস, আশা ভালোবাসা, জীবন সংসার, দীপু নাম্বার টু, শ্রাবণ মেঘের দিন।

গোলাম মুস্তাফা ঢাকা টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে নাটকে অভিনয় শুরু করেন। প্রথমদিকে ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নাটকে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে- গুপ্তধন, অর্পিতা, হিতঙ্কর, পাথরে ফুটাবো ফুল, যুবরাজ, অস্তরাগে।

গোলাম মুস্তাফা ১৯৮০ সালে সেরা পার্শ্বচরিত্র অভিনেতা এবং ১৯৮৬ সালে সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০০১ সালে পান একুশে পদক । তিনি বাচসাস পুরস্কারও পেয়েছেন।

২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান এই অভিনেতা।

কিংবদন্তি অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার হাত ধরেই এদেশে আবৃত্তি চর্চার উর্বর ভূমি রচিত হয়েছে। তাই আবৃত্তিতে তার ভূমিকা অনন্য। আর এ কারণেই এই কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ’ চলতি বছর থেকে চালু করেছে ‘গোলাম মুস্তাফা আবৃত্তি পদক’।

একুশে ফেব্রুয়ারির মাত্র এক দিন আগেই মৃত্যুবরণ করেন শক্তিমান আবৃত্তি ও অভিনয়শিল্পী গোলাম মুস্তাফা। ২০০৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে প্রতিবছর দিনটিতে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ আয়োজন করে গোলাম মুস্তাফা স্মরণ ও একুশের প্রথম প্রহর উদ্যাপন অনুষ্ঠান।