আশা’র ঋণে কাঁদছেন রহিমা, ভেঙ্গে নিলো একমাত্র ঘরটি!

মোঃ ইউনুস আলী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে বিলম্ব হওয়ায় রহিমা বেগম (৩২) নামের এক হতদরিদ্র নারীর টিনশেড ঘর বিক্রি করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এনজিও আশার বিরুদ্ধে। একমাত্র মাথা গোজার ঠাই টুকু হাড়িয়ে হোসাইন মোহাম্মদ (৮) ও হোসাইন আহমদ (৫) নামের দুই সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নীচে রয়েছেন ঐ নারী। ঐ গ্রামের অভিযুক্ত সৈয়দ আলী এর জন্য দায়ী বললেন রহিমা।

লালমনিরহাট পৌর এলাকার চার নং ওয়ার্ডের সৈয়দমোড় নদীরপাড় এলাকার আমীর হোসেনের স্ত্রী রহিমার বাড়ীতে ঘটনাটি ঘটে। তার স্বামী ঢাকার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকরী করেন।

রহিমা বলেন, গত বছরের (১৮ আগস্ট) ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এনজিও আশা থেকে ২৬ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করেন। এরপর ৭০০ টাকা করে তিনটি সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করে তিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকরী করার জন্য স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে যান। একমাসের মধ্যে রহিমা অসুস্থ্য হয়ে পড়লে টঙ্গি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা নিয়ে আবারো চাকরী করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করেন রহিমা। তিনি ওই এনজিও’র কর্মকর্তার মোবাইলে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠান। মাঝখানে কয়েকটি কিস্তি দিতে বিলম্ব হলে একমাস আগে আশা এনজিও’র লোকজন স্থানীয় মৃত বদিয়ার রহমানের ছেলে সৈয়দ আলীকে নিয়ে তার একমাত্র মাথা গোজার ঠাই টিনশেড ঘরটি বিক্রি করে দেয়।

rohima-asaকান্নাজনিত কন্ঠে রহিমা বলেন, অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে গেল বছর আমি ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে আমু বিশ ফিট টিনশেড ঘরটি করেছিলাম। মাত্র আড়াই শতাংশ জমির উপর ঘরটিই ছিলো একমাত্র সম্বল। আমার সেই মাথা গোজাবার আশ্রয় টুকু তারা কেড়ে নিয়েছে। ফলে আমি সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নীচে বহু কষ্টকরে দিনাতিপাত করছি।

তিনি আরও বলেন, ঋণ নিয়েছি আর ঋনের টাকাও পরিশোধ করেছি তবে দারিদ্রতার কারনে মাঝখানে একটু বিলম্ব হয়েছে মাত্র। আর এজন্যই তারা আমার আশ্রয়টুকু কেড়ে নিলো। তাদের কি কোন মানবতা নেই।

অভিযুক্ত সৈয়দ আলী দাবি করে বলেন, রহিমা বেগমের ঋণের জামিনদার হয়েছিলেন তিনি। তার ঋণের কিস্তি দিতে বিলম্বিত করায় আশা’র লোকজন তাকে চাপ দিতে থাকনে। আশা এনজিও’র লোকজনের পরামর্শক্রমে আমি নিরুপায় হয়ে রহিমা’র একমাত্র টিনশেড ঘরটি তিন হাজার টাকায় বিক্রি করে তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করি।

তবে এনজিও আশা’র লালমনিরহাট সদর ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার নুরুল ইসলাম এটি অস্বীকার করে বলেন, তারা রহিমার ঘর বিক্রি সম্পর্কে অজ্ঞাত। তাছাড়া রহিমা ঋণ থেলাপি ছিলেন না, তিনি তাদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ রাথছিলেন।

সৈয়দ আলী ওই ঋণের জামিনদার ঠিকই কিন্তু তাকে কোন চাপ দেয়া হয়নি আর তিনি ঋণের কোন কিস্তিই আমাদেরকে দেননি। আমাদের সদস্য রহিমার ঘর বিক্রির সাথে আশা’র কোন যোগসুত্র নেই আর পুরো ব্যাপারটি স্থানীয় সৈয়দ আলীই জড়িত তার দাবী।

রহিমা বেগম এথন কেঁদে কেঁদে স্থানীয় লোকজনের কাছে বিচার দিচ্ছেন। স্থানীয গ্রামবাসী এ ব্যাপারে সুষ্ঠ্য বিচার না করলে হতদরিদ্র রহিমা আইনের আশ্রয় নিবেন বলে জানিয়েছেন।

লালমনিরহাটে কাজীর লাইন্সেস বাতিলের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

লালমনিরহাটে দীর্ঘ ৯ বছর পর মৃত নিকাহ রেজিষ্ট্রারের লাইন্সেস বাতিলের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে তার পরিবারের লোকজন। শুক্রবার সকাল ১১টায় জেলা রেজিষ্ট্রার কার্যালয়ের নিকাহ রেজিষ্ট্রার সমিতির কক্ষে মৃত কাজী সুলতান আহম্মেদের পুত্র ও বর্তমান দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রার মাহমুদুল হাসান এ সংবাদ সম্মেলন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মাহমুদুল হাসান বলেন, জেলার আদিতমারী উপজেলার ১নং দুর্গাপুর ইউনিয়নে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নিকাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে দায়িত্বপালন করে আসছি। বর্তমানে আমি জেলা নিকাহ রেজিষ্ট্রার (কাজী) সমিতি’র সদস্য। আমার পিতা মরহুম সুলতান আহম্মেদ নিকাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে দুর্গাপুর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকাকালীন ২৫ জানুয়ারি ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর জেলা রেজিষ্ট্রারের অফিস আদেশে দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট থেকে তার মৃত্যুর সনদ সংগ্রহ করে এবং ওই ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রারের পদটি শুন্য ঘোষনার পর সরকারকে অবগত করা হয়।

পরবর্তীতে ২০০৮ সালের মার্চ মাসের ৪ তারিখে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম উক্ত শুন্যপদে নিকাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেন। যার স্মারক নং জেএম/০৩-৮১/০৬/০৮/১৮৩/১(৮)। জেলা প্রশাসকের আদেশের প্রেক্ষিতে ওই মাসের ১১ তারিখে জেলা রেজিষ্ট্রার মোঃ আবুল কালাম ইয়াহিয়া নিকাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে লাইসেন্স প্রদান করেন। যার স্মারক নং ১৩৩(৬)।

তিনি আরও বলেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারী’১৭ স্থানীয় দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট থেকে হঠাৎ জানতে পারি, ১৪ নভেম্বর ২০০৭ সালে জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রার (কাজী) সুলতান আহম্মেদ এর বিরুদ্ধে আনীত বাল্যবিয়ে রেজিষ্ট্রারী করার অভিযোগে আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জি.এম.নাজমুছ শাহাদাৎ মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি ১১ অনুয়ায়ী সুলতান আহম্মেদ নামীয় নিকাহ রেজিষ্ট্রারের লাইন্সেস বাতিলের আদেশ দেন। সে আদেশের প্রেক্ষিতে জেলা রেজিস্ট্রার সরকার লুৎফর কবীর স্বাক্ষরিত এক আদেশে ওই ইউনিয়নে নিকাহ রেজিষ্ট্রারের পদটি শুন্য ঘোষনা করে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর ১৭(৪) উপবিধি মোতাবেক দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রার (কাজী) এজাজুল ইসলামকে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, যে ব্যক্তি ২০০৮ সালের ২৫জানুয়ারি মারা যান, সেই ব্যক্তির লাইন্সেস ২০০৯ সালের জারিকৃত আইন অনুয়ায়ী ২০১৬ সালে কিভাবে মৃত ব্যাক্তির লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে ? তা আমার বোধগম্য নয়। আর যেখানে আমি লাইসেন্স প্রাপ্ত নিকাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি এবং নিকাহ রেজিষ্ট্রারের যাবতীয় সরকারী অর্থ সরকারকে প্রদান করছি সেখানে কিভাবে আরেকজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি বলেন, জেলা রেজিষ্ট্রারের দাবীকৃত আর্থিক চাহিদা পুরন না করায়, মন্ত্রনালয়ের কাগজ জাল করে পরিকল্পিতভাবে আমাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পায়তারা করছে। আর তাকে ইন্ধন যুগিয়েছেন তার কাছের কয়েকজন নিকাহ রেজিষ্ট্রার ও জেলা রেজিষ্ট্রি অফিসের কম্পিউটার অপারেটর মনিরুজ্জামান। তিনি তার ওই অবৈধ আদেশের কার্যকরিতা বন্ধে সরকারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও দূর্নীতিবাজ ওই কর্মকর্তার শাস্তি দাবী জানান। সেই সাথে জেলা রেজিষ্ট্রারের এই আকস্মিক আদেশে তিনি সামাজিক, আর্থিক ও মানুষিকভাবে মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলেও জানান।

lalmonirhat press realiceতবে লালমনিরহাট জেলা রেজিস্ট্রার সরকার লুৎফর কবীর দাবীকৃত আর্থিক চাহিদার কথা অস্বীকার করে বলেন, ২০০৯ এর বিধি ১১ অনুয়ায়ী সুলতান আহম্মেদ নামীয় নিকাহ রেজিষ্ট্রারের লাইন্সেস বাতিলের আদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সুলতান আহম্মেদের মৃত্যুর ৯ বছরের মধ্যে কেন বিষয়টি সমাধা করা হলো না এবং কেন এতোদিন পরে একজনের দোষ আরেকজনের উপর দিয়ে তার দায়িত্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে ? এ ব্যাপারে তিনি কোন সদুত্তর দিতে না পারায় বিষয়টি এড়িয়ে যান।