মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি মুফতি হান্নানকে ছিনতাই পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস

সময়ের কণ্ঠস্বর – ময়মনসিংহের ত্রিশালের ঘটনার আদলে দুর্ধর্ষ দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ছক কষা হয়েছিল। এবার টার্গেট ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ নেতা মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শরিফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল।

কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পথে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে হুজিবি সদস্যরা। এ পরিকল্পনায় তাদের সঙ্গে আরেক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) একটি অংশও জড়িত ছিল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই জঙ্গি কাশিমপুর কারাগার এলাকা রেকি করে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও শাহজাহানপুর এলাকায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) পৃথক অভিযান চালিয়ে তিন জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর এ পরিকল্পনা প্রকাশ পায়।

দুই অভিযানে গ্রেফতার তিন জঙ্গি হলো – আবু বক্কর সিদ্দিক মাহমুদ ওরফে আল হাদি (২২), জাভেদ হোসাইন (১৯) ও সালেহ আহমদ (৪৯)। সর্বশেষ গত বুধবার অভিযান চালিয়ে শাহজাহানপুর থেকে সালেহকে ও গত ২২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে মাহমুদ ও জাভেদকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ও শাহজাহানপুর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। সালেহকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে গতকাল শনিবার এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে তিন জঙ্গি রাকিব, বোমা মিজান ও সালেহীনকে ছিনিয়ে নেয় জামা’আতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশ (জেএমবি)। দীর্ঘদিন পর আবারও জঙ্গি ছিনতাই ও হুজিবি চাঙ্গা করার পরিকল্পনার তথ্য বেরিয়ে এলো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসির ডিসি মহিবুল হক খান বলেন, হুজিবি নতুনভাবে দল গোছানোর চেষ্টা করছে। তাদের একটি গ্রুপ মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। তবে পুলিশ তাদের তৎপরতা রুখে দিতে সজাগ রয়েছে।

mufti-hannan

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মিজানুর রহমান বলেন, মুফতি হান্নানসহ দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের আদালতে আনা-নেওয়ার সময় যে কোনো সময়ের তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন বেশি সতর্ক। তাদের বহনকারী প্রিজনভ্যানের সামনে-পেছনে একাধিক টিম থাকে।

গত বুধবার সালেহকে গ্রেফতারের পর শাহজাহানপুর থানায় এসআই শাহজাদা আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় উল্লেখ করা হয়, কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পথে মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছে সালেহসহ ৪-৫ হুজিবি সদস্য। তারা শাহজাহানপুরে রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের উত্তর পাশে একটি আস্তানায় জড়ো হয়।

জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ১০ বছর ধরে খোঁজ রাখেন এমন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সালেহ ছাড়াও মুফতি হান্নান ও বিপুলকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছিল জঙ্গি সালমান ও জুনায়েদ। জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল জুনায়েদ। সে তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। জুনায়েদ বর্তমানে এবিটির সঙ্গে জড়িত থাকলেও আগে সে হুজিবির সদস্য ছিল। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটে। হুজিবির পুরনো সদস্য জুনায়েদ ও এবিটির সদস্য সালমানের পরিকল্পনামাফিক মুফতি হান্নান ও বিপুলকে ছিনিয়ে নিতে মাহমুদ ও জাভেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ দু’জন এবিটির সক্রিয় সদস্য। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে মাহমুদ ও জাভেদ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাশিমপুরে কারাগার এলাকা রেকি করে তারা। জুনায়েদ ও সালমানের নির্দেশে তারা সেখানে যায়। জুনায়েদ জানায়, সে আত্মীয় পরিচয়ে আপেল নিয়ে কারাবন্দি বিপুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায়। এরই মধ্যে গোয়েন্দারা তাদের সঙ্গে মাহমুদ ও জাভেদের যোগাযোগের বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া একজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের এক সদস্যের কাছ থেকেও নিয়মিত টাকা নিত সালমান।

দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মাহমুদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার বারহাট্টার মাঝপাড়ায়। সে বারহাট্টা কৈলাটি এফইউ ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। জুনায়েদ বিয়ে করে নেত্রকোনায়। সে সূত্রে তার সঙ্গে মাহমুদের পরিচয়। এ ছাড়া এক সময় মাহমুদ সিলেটে জুনায়েদের খালার বাসায় লজিং থেকে পড়াশোনা করত। আরেক জঙ্গি জাভেদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার মুসিবপুরে। সে ইনাতগঞ্জে মা ফাতেমা দাখিল মাদ্রাসার ছাত্র।

জানা গেছে, হুজিবির সদস্য সালেহ আহমদের আস্তানা থেকে ‘শত্রু দেশে মুসলিম গোয়েন্দা’, ‘ফাজায়েলে জিহাদ’, ‘যুদ্ধ-জিহাদ’ নামে বই পাওয়া যায়।

বিভিন্ন সময় হুজিবি দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৩টি নাশকতামূলক হামলায় জড়িত। এতে নিহত হয়েছেন ১০১ জন। আহত হয়েছেন ৬০৯ জন। এসব হামলার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা পালন করে মুফতি হান্নান। বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয়েছে। দুটির বিচার শেষ হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়ে মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি ও দু’জনের যাবজ্জীবন হয়েছে। এরই মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের মৃত্যু পরোয়ানা কারাগারে পৌঁছেছে।