মানিকগঞ্জে বিলুপ্তির পথে কুমার সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্প

দেওয়ান আবুল বাশার, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় দৌলতপুর, নিলুয়া, খলসী, ঘিওরের তেরশ্রী পালপাড়ায় নাম মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িয়েছিল কয়েক শত হিন্দু পরিবার। তারা এলাকায় কুমার বা পাল নামেও পরিচিত।

silpo

কুমার সম্প্রদায়ের হাঁড়ি-পাতিল ও কলসসহ যে কোনো মৃৎশিল্প তৈরিতে প্রধান উপকরণ হচ্ছে এটেল মাটি, জ্বালানি কাঠ, শুকনো ঘাস ও খড়। এক সময় মাটির তৈরি জিনিসের বহুমাত্রিক ব্যবহার ছিল।

তখন এ শিল্পের সব মহলেই কদর ছিল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এ শিল্পের মালামাল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও সরবরাহ করা হতো। সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে কুমাররা মাটি দিয়ে তৈরি পাতিলের বোঝাই ভার নিয়ে দলে দলে ছুটে চলত প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায়।

পাতিল, গামলা, কূপি বাতি, থালা, জাতা, দুধের পাত্র, ভাঁপাপিঠা তৈরির কাজে ব্যবহৃত খাঁজ, গরুর খাবার পাত্র, কুলকি, ধান-চাল রাখার বড় পাত্র, কড়াই, কূয়ার পাট, মাটির ব্যাংক, শিশুদের জন্য রকমারি নকশার পুতুল, খেলনা ও মাটির তৈরি পশুপাখি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত এবং পণ্যের বিনিময়ে ধান সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় ধান বোঝাই ভার নিয়ে ফিরে আসত বাড়িতে।

ওই সব ধান বিক্রি করে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনত। কিন্তু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার অভাবে আজ এ শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় মৃৎশিল্প এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে।

কুমাররা মাটির তৈরি জিনিস হাট-বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু তেমন বেচাকেনা নেই। এখন দিন বদলে গেছে। সবখানেই এখন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। তাই মাটির তৈরি জিনিসের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। ফলে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পাল ও কুমার পরিবারগুলো আর্থিক সঙ্কটসহ নানা অভাব অনটনে জড়িত।

স্বাধীনতার প্রায় ৪৫ বছরে দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি মৃৎশিল্পের। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় কুমার পরিবারগুলোর নেই কোনো আধুনিক মেশিন ও সরঞ্জাম।

এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই বাপ-দাদার এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। দৌলতপুর গ্রামের বদন কুমার পাল, সাধন কুমার পাল, হাজারি কুমার পাল, বাবু কুমার পাল ও কার্তিক কুমার পাল জানান, অভাব অনটনের মধ্যে ও হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে আছে। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, ঢাকনা হাট-বাজারে ভ্যানভাড়া দিয়ে হাটে আনলেও জিনিস বিক্রি হয় না।

এখন তাদের অনেকেরই অবস্থা শোচনীয়। তাঁরা জানান, হাঁড়ি-পাতিল ও অন্যসব জিনিসপত্র তৈরি করতে কাঁচা মাল এটেল মাটি আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদী থেকে সংগ্রহ করা যেত। বর্তমানে নদী ভরাটের কারণে নদী থেকে আর মাটি তোলা যায় না। তাই পাশের গ্রাম থেকে টাকা দিয়ে মাটি কিনে ভ্যানে করে আনতে হয়।

হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে মাটির জিনিস তৈরি করে রোদে শুকিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে ব্যবহারযোগ্য করে সেগুলো জেলা-উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়। মৃৎশিল্পীরা সরকারের কাছ থেকে স্বল্পশর্তে ঋণ সহায়তা পেলে হয়ত এ পেশা চালিয়ে যেতে পারবেন বলে তাঁরা দাবি করেন।