প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ বাগদার রেণু নিধন, মারা পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির কোটি কোটি পোনা মাছ!

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধিঃ

কলাপাড়ার উপকূলীয় এলাকায় সাগর ও নদীতে বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা নিধনের চলছে মহা উৎসব। প্রকাশ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে সুক্ষ্ম ফাঁসের মশারি নেটের হাজার হাজার বেহুন্দি ও বক্স আকৃতির জাল পেতে পোনা মাছ নিধনের এ ভয়াবহ তান্ডব চলছে। স্থানীয় পুলিশ, মৎস্যবিভাগ, নৌ-বাহিনী, কোস্টগার্ডসহ কারও নাকের ডগায় আবার কোথাও গোপনে চলছে মৎস্যসম্পদ নিধনের এমন তান্ডব। এসব পোনার সাথে মারা যাচ্ছে অন্য প্রজাতির কোটি কোটি বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেনু। প্রতিদিন শুধুমাত্র কলাপাড়ার উপকূলীয় নদী ও সাগরবক্ষে কোটি কোটি পোনা নিধন হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এসব দেখার কেউ নেই।

এসব পোনা আবার প্রকাশ্যে বিভিন্ন হাট-বাজারের আড়তে পাইকারি ক্রয়-বিক্রয় চলছে। পোনা ধরা নিষেধ-এমন প্রচার চালিয়ে আবার আড়ত মালিকরা আহরণকারী দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে লোনা পানির পোনা কিনছে পানির দরে। সর্বোচ্চ ৩০টাকায় এক শ’ রেণু পোনা বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছে গরিব জনগোষ্ঠী। যে যেভাবে পারছে কৌশলে লাভবান হচ্ছে। অথচ দেশ হারাচ্ছে মাছের বিশাল ভান্ডার। কোস্টগার্ডসহ মৎস্য প্রশাসন অভিযান চালালে তখন পোনা ধরার প্রবণতা কিছুটা কমে। কিন্তু সম্পুর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। গরিব জনগোষ্ঠী আবার পেটের যোগান দিতে রাতের বেলা পোনা আহরণ করছে। তবে পোনা আহরণের পরিমাণ এখন অনেকটা কমেছে বলে প্রশাসনের দাবি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াকাটা সৈকতের খাজুরা থেকে কাউয়ারচর পর্যন্ত এবং রামনাবাদ নদীর শেষপ্রান্তে সাগর মোহনা চরধুলাসার সৈকতে অন্তত পাঁচ শতাধিক জাল পাতা রয়েছে। সাগর কিংবা নদীর পাড় থেকে আড়াআড়ি খুটা গেড়ে একটি দড়ির সঙ্গে অন্তত কুড়িটি করে বেহুন্দি জাল পেতে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ আবার মশারি নেট পানির নিচে ডুবিয়ে রাখছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে শত শত জাল পাতা রয়েছে। কুড়িটি বেহুন্দি ছোট্ট নেটে অন্তত একেক বারে দুই-তিন শ’ বাগদার রেণু ধরা পড়ছে। কতক্ষণ পর পর জেলেরা জাল থেকে রেণু পোনা গামলা কিংবা অন্য পাত্রে এনে বেলাভূমে বাগদার রেণু বাছাই করে বালুতেই অন্য প্রজাতির পোনা ফেলে দেয়। পানির পাত্রে সংরক্ষণ করায় মারা পরছে না বাগদার রেণুপোনা। কিন্তু অন্যসব পোনা মরে যাচ্ছে মুহুর্তের মধ্যেই।

পোনা শিকারী শাহীন জানান, কুড়িটি জালে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৭০০ বাগদার রেণুপোনা পেয়েছেন। এজন্য অন্য প্রজাতির সাদা মাছের রেণু পোনা মারা গেছে কমপক্ষে ৪৯ হাজার। চর ধুলাসার গ্রামের আব্দুল হামেদের ছেলে চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র সবুজ জানায়, রাতভর ৯০০ পোনা ধরেছে। ৩০ টাকায় এক শ’ পোনা বিক্রি করছে। মাদ্রাসা ছাত্র নাজমুল ও স্কুল ছাত্র লিমন বক্স নেটে পোনা আহরণ করছিল। তারা জানায়, লেখাপড়ার ফাঁকে সংসারের বাড়তি যোগানে তারা প্রতিদিন বাগদার রেণু পোনা ধরছে। একটি বেসরাকরী উন্নয়ন সংস্থার প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে জানা যায়, একেকটি বাগদার রেণু শিকার করতে গড়ে অন্য প্রজাতির পোনা মারা পড়ছে ৭০-৭২টি। এভাবে গোটা উপকূলে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির কোটি কোটি পোনা মাছ মেরে ফেলা হচ্ছে।
আড়তের ঘাটে একটি ট্রলার বাধা রয়েছে জমাকৃত পোনা কেনার জন্য। বাগদার রেণু পোনা আহরণ নিষিদ্ধ-এমন ভয় দেখিয়ে আহরণকারী গরিব মানুষের কাছ মাত্র ৩০ টাকায় একশ বাগদার রেণু পোনা কেনা হচ্ছে। অথচ আড়ত মালিকরা এক শ’ রেণু পোনা বিক্রি করছে ৭০ থেকে এক শ’ টাকায়। বাবলাতলা বাজারের একটি আড়তে শত শত মাটির পাতিলে বাগদার রেণু পোনা বিক্রির জন্য মজুদ করা রয়েছে। গণনাকারী জানান, আড়তটির মালিক মাসুদ রানা।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক আড়ত মালিক ও পাইকাররা জানান, এখন ট্রলারে ওপেনভাবে পোনা চালান করা যায় না। বিআরটিসিসহ বিভিন্ন বাসের বাঙ্কারে কিংবা ছাদে প্লাস্টিকের বয়ামে। পলিথিনে অক্সিজেন সংরক্ষণের মাধ্যমে পোনা চালান করা হয়। এজন্য আবার ঘাটে ঘাটে রাজনৈতিক কর্মী, পুলিশ প্রশাসনসহ কথিত মিডিয়াকর্মীদের পর্যন্ত বখড়া দিতে হয়। এজন্য প্রচুর টাকা ব্যয় হয়।

kolapara-renuবাবলা তলা বাজারের মাসুদ রানার রয়েছে বিরাট আড়ত। প্রকাশ্যে বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা কেনা-বেচা চলছে। একই অবস্থা চাপলী বাজার, লক্ষ্মীর হাট, আলীপুর, খালগোড়া, খাজুরা, আশাখালী, বানাতি বাজার, চারিপাড়া, হাজিপুরসহ সর্বত্র। প্রকাশ্যে পোনা কেনা-বেচা চললেও আড়তগুলো বন্ধ হয়নি। কখনও কখনও কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী কিংবা মৎস্য বিভাগ নদীপথে ট্রলারে হানা দিয়ে পোনার হাড়ি নদীতেই অবমুক্ত করে। নদী কিংবা সাগরে পানির মধ্যে পোনা বাছাই করে বাগদার রেণু রেখে বাকিসব পোনা পানিতে ছেড়ে দেয়ার জন্য সচেতন করা প্রয়োজন। আর নিষেধাজ্ঞার অযুহাতে পোনা শিকারী গরীব মানুষগুলো জীবিকার প্রয়োজনে ধরা পোনার দাম সঠিক ভাবে পাচ্ছেনা। লাভবান হচ্ছে একশ্রেণির আড়তমালিক।

এব্যাপারে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানালেন, তাদের লোকবল সঙ্কটসহ বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা। এছাড়া প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে, পোড়ানো হচ্ছে সব ধরনের সুক্ষ ফাঁসের জাল। সর্বশেষ প্রায় সাতলাখ রেনু আটক করে নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি জানালেন। তবে সচেতন মহলের ধারনা বাগদার রেণু পোনা আহরণের সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু পোনা নিধনের তান্ডব ঠেকাতে না পারলে সাগর কিংবা নদী মাছ শুন্য হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।