দিনাজপুরে পরিবেশের পরম বন্ধু শকুন অবমুক্ত

শাহ্ আলম শাহী, স্টাফ রিপোর্টার: পরিবেশের পরম বন্ধু শকুনের নিরাপদ এলাকা নিশ্চিত করণ ও শকুন সংরক্ষণে সচেতনা বৃদ্ধিমুলক কর্মসূচীর আওতায় দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা। এছাড়াও উদ্ধারকৃত ৮ শকুনকে সেবা পরিচর্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

sokun-mukto

শকুন এক প্রকার পাখি। এটি মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে থাকে। পাখিগুলো তীক্ষ দৃষ্টির অধিকারী শিকারি পাখি বিশেষ। বিশালাকার গাছে সাধারণত শকুন বাসা বাঁধে। সারা বিশ্বে প্রায় ২৩ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এর মধ্যে ৬ প্রজাতির শকুন আমাদের দেশে রয়েছে। ৪ প্রজাতি স্থায়ী আর ২ প্রজাতি পরিযায়ী।

শকুন বা বাংলা শকুন ছাড়াও এতে আছে রাজ শকুন, গ্রীফন শকুন বা ইউরেশীয় শকুন হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। দেশে তিন প্রজাতির শকুন স্থায়ীভাবে বসবাস করত। এর মধ্যে এক প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির পথে দেশি প্রজাতির বাংলা শকুনও। শকুন অধিকাংশই বিপন্নপ্রায়। তাই এই শকুন দেখতে এখন মানুষ ভীর করছে।

পাঠ্যপুস্তকে পড়লেও বাস্তবে শকুন দেখে বেশ আপ্লুত এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। শকুনকে বলা হয় প্রকৃতির ঝাড়ুদার। তবে এক সময় মানুষ মনে করতো শকুন পাখিটা অশুভ। অনেকে আবার মৃত্যুর প্রতীক হিসেবেও কল্পনা করতেন এটিকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন অশুভ তো নয়ই, হিংস্রও নয়। চিল, ঈগল বা বাজপাখির মতো শিকারিও নয়। এটা আমাদের পরিবেশের পরম বন্ধু। মৃত পশু খেয়ে শকুন আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। শকুন কখনোই জীবিত মানুষকে আক্রমণ করে না। গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যথা নাশক ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন জাতীয় ঔষুধ ব্যবহার শকুন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ওই ঔষুধ ব্যবহার করা গরু ও ছাগলের মৃতদেহ ভক্ষণ করলে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শকুন মারা যায়। বাংলাদেশ সরকার ২০১০ইং সালে গবাদিপশুর চিকিতৎসায় ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তবে কোথাও কোথাও এখনও ব্যবহার হয়। অন্যদিকে ফসলের মাঠে কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সংকট, কবিরাজি ঔষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, বিমান-ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঘুড়ির সুতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, ইউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ, বাসস্থানের অভাব প্রভৃতি কারণ জড়িত রয়েছে। শকুনের বাসা বাঁধার স্থানের অভাবের জন্য তাদের বংশ বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে বীরগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান সিংড়া ফরেস্ট। প্রায় ৭শ একর বিস্তৃত বিশাল বনভুমিতে উদ্ধারকৃত ৮ শকুনকে সেবা পরিচর্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

এই শকুনের নিরাপদ এলাকা নিশ্চিত করণ ও শকুন সংরক্ষণে সচেতনা বৃদ্ধিমুলক কর্মসূচীর আওতায় সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা। আইইউসিএন বাংলাদেশ এবং বন বিভাগের উদ্যোগে এ আলোচনা সভায় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশাজীবীর মানুষ অংশ নেয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, আইইউসিএন বাংলাদেশ এর কাট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ।

বক্তব্য রাখেন দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সরকার, দৈনিক উত্তর বাংলার সম্পাদক মোঃ মতিউর রহমান, বন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম তুহিন, দৈনিক মানবজমিন ও চ্যানেল আই’র স্টাফ রিপোর্টার শাহ্ আলম শাহী, দৈনিক প্রথম আলো’র সাংবাদিক আসাদুল্লাহ সরকারসহ অন্যরা।

বক্তারা বলেন, প্রকৃতির ঝাড়ুদার খ্যাত পরিবেশের পরম বন্ধু শকুন টিকিয়ে রাখতে সরকারের যেমন দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন জনসচেতনতা।