দেশে আবারও আগ্রাসী জঙ্গিরা!

সময়ের কণ্ঠস্বর জঙ্গিরা ফের আগ্রাসী! কুমিল্লায় পুলিশের ওপর বোমা হামলা, ২ জঙ্গি আটক * সারাদেশে পুলিশের সতর্কতা জারি *জঙ্গিদের নির্মূল করতে পারিনি তবে নিয়ন্ত্রণে এনেছি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হঠাত্ করেই আবার আগ্রাসী হয়ে উঠেছে জঙ্গিরা।

গত জুলাইয়ে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্টুরেন্টে হামলার পর দেশব্যাপী জঙ্গি বিরোধী কঠোর অভিযানে নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট একের পর এক জঙ্গি আস্তানায় হানা দিয়ে জঙ্গিদের গ্রেফতার করে।

ওই অভিযানে নিহত হয় শীর্ষস্থানীয় বহু জঙ্গি। এতকিছুর পরও জঙ্গিদের তত্পরতা থেমে নেই। গত ৮ দিনে তিনটি হামলা চালাল জঙ্গিরা। প্রতিটি হামলাই পুলিশের উপর। সর্বশেষ গতকাল কুমিল্লায় বাস থেকে নেমে দুই জঙ্গি পুলিশের উপর বোমা হামলা শুরু করে। এর আগে গত সোমবার টঙ্গিতে মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নিতে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানো হয়। তার আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়িতে পুলিশ কনস্টেবলদের ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করে জঙ্গিরা।

kumillay jongi-08-03-2017

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওরা তো নিশ্চিহ্ন হয়নি। ওরা তো চাইবে কিছু করতে। সেটাই করছে। আমরা তত্পর বলেই তো ওরা কিছু করতে পারছে না। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশও তত্পরতার সঙ্গে কাজ করছে বলেই তো সর্বশেষ সবকটি ঘটনায় জঙ্গি ধরা পড়েছে।’ পুলিশ সদর দফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা এই ধরনের হামলার আশঙ্কা করে আগেই সতর্ক করেছিল।

পুলিশ সদর দফতর থেকেও দেশের সবকটি থানাকে সতর্ক করা হয়েছিল। ফলে সম্প্রতি জঙ্গিদের হামলার ঘটনাগুলোতে পুলিশও তত্পর ছিল। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রিজন ভ্যানে হামলা এবং কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দেশে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করা যাবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারিনি, তবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। দেশের মানুষ একত্রে থাকলে আমরা আরো সাফল্য অর্জন করবো। পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করেছেন। যতদিন সাধারণ মানুষ এক থাকবেন ততদিন এদেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।

র‍্যাবের  মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘যা কিছু হচ্ছে তার সবই আমাদের নখদর্পণে আছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে। যেটা অব্যাহত থাকবে। এখন তারা খুব একটা কিছু করতে পারবে না।’

কুমিল্লায় পুলিশের উপর বোমা হামলা : কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির গতিরোধে পুলিশের অভিযান চলাকালে হাইওয়ে পুলিশের ওপর বোমা মেরেছে জঙ্গিরা। পরে বোমা ও ছুরিসহ জসিম (২২) ও হাসান (২৪) নামে দুই জেএমবি সদস্যকে আটক করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এদের মধ্যে জসিম গুলিবিদ্ধ হয়। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টায় তীরচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

আটক হাসান চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার শান্তিরহাট গ্রামের মৃত মোহাম্মদ হোসাইনের ছেলে এবং জসিমের পরিচয় পাওয়া যায়নি। চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাছির উদ্দিন মৃধা বলেন, ‘হামলাকারীরা আল্লাহু আকবার বলেই পুলিশের ওপর বোমা হামলা করে। তারা জেএমবির সদস্য বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

হাইওয়ে পুলিশ ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ির এসআই মনিরুল ইসলাম জানান, ‘মহাসড়কে চলাচলরত বেশি গতি সম্পন্ন গাড়ি চিহ্নিতকরণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় অভিযান চলছিল। ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ির সার্জেন্ট কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ওই অভিযান চলাকালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের গতি অনেক বেশি বলে চিহ্নিত হয়। পুলিশ গাড়িটিকে থামতে বলার পরেও না থামায় এটিকে ধাওয়া করে আটক করা হয়। এরপর বাস থেকে নেমেই যাত্রীবেশী দুই জেএমবি সদস্য আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে। তবে ওই বোমা বিস্ফোরিত না হওয়ায় তাদের ক্ষতি হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া শুরু করলে তারা বোমা ছোঁড়া অবস্থায় দৌড়ে গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় ২৪টি গুলি ছুঁড়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাদেরকে আটক করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জসিমকে এবং হাসান নামে আরও একজনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৪টি বোমা ও ১টি ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়। জসিম ও হাসানকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার পরপর হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চল সুপার রেজাউল করিম, জেলা পুলিশ সুপার শাহ মো. আবিদ হোসেন, চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম জাকারিয়া, ওসি নাছির উদ্দিন মৃধাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান।

প্রিজন ভ্যানে হামলা, জঙ্গি মোস্তফার বাবা-মা ও দুই ভাই আটক : টঙ্গীতে গত সোমবার শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগীদের বহনকারী প্রিজন ভ্যানে গ্রেনেড হামলাকারী জঙ্গি মোস্তফা কামালের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দার পূর্ব পাগুলী গ্রামে। এ খবর ছড়িয়ে পরার পর ওইদিন রাতেই ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ মোস্তফার বাড়িতে অভিযান চালায়। এসময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোস্তফার বাবা মোফাজ্জল হোসেন, মা আছিয়া খাতুন, বড় ভাই আব্দুল মোতালেব ও শরিফুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ।

ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, মোস্তফা কামাল ৪ বছর আগে তারাকান্দা বড় মসজিদ থেকে কোরআনে হেফজ সম্পন্ন করে। গত দেড় বছর ধরে সে নরসিংদী শেখের চর কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে আসছে। মোস্তফা ছুটির কথা বলে গত মাসের ১০ তারিখে মাদ্রাসা থেকে চলে আসে। এ সময় বাড়ি থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়ে সে আর ফিরে আসেনি। এভাবেই হয়তো সে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।

মোস্তফার বাবা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমার ছেলে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে এটা মানতে পারছি না। পরিবার ও এলাকাবাসীও এতে অবাক হয়েছে। তিনি আরও জানান, কৃষি কাজ করে অনেক কষ্টে মোস্তফাকে মানুষ করার জন্য নরসিংদী পাঠালাম কিন্তু সে জঙ্গি হলো, এটা মেনে নেওয়া যায় না। স্থানীয় বালিখা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম দুদু জানান, মোস্তফা জঙ্গি কার্যক্রমে যোগদান করবে এটা বিশ্বাস করা যায় না।

জঙ্গি মোস্তফা ৫ দিনের রিমান্ডে : গাজীপুরের টঙ্গীতে জঙ্গিনেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগীদের বহনকারী প্রিজন ভ্যানে হামলার ঘটনায় জঙ্গি মোস্তফা কামালের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. আমীর হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল মঙ্গলবার মোস্তফাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে গাজীপুর আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে সোমবার রাতে টঙ্গী থানায় জঙ্গি মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। টঙ্গী থানার এসআই অজয় কুমার চক্রবর্তী বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি (নং ১০) দায়ের করেন। মামলায় ঘটনাস্থল থেকে আটক মোস্তফা কামালসহ আরও অজ্ঞাত কমপক্ষে আটজনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

রাজশাহীতেও পুলিশের উপর জঙ্গি হামলা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি বিরোধী অভিযানের সময় বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের ওপর হামলা চালায় জেএমবির সদস্যরা। এসময় পুলিশের দুই সদস্যকে এলোপাতারি কুপিয়ে জখম করে। পুলিশ গ্রেফতার করে জেএমবির এক জঙ্গিকে। পরে সে মারা যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পুলিশের উপর হামলাকারী আজিমুল ইসলাম (২৪) জেএমবির সঙ্গে জড়িত। সে রাজশাহী অঞ্চলে জেএমবির সাংগঠনিক তত্পরতা চালাচ্ছিল। আজিমুল মাঝে মধ্যেই বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ৩/৪ দিন পর ফিরতো। আবার মাঝে মধ্যে বাহির থেকে তার বাড়িতে লোকজনও এসে ২/১ দিন থেকে চলে যায়। সে এবং তার পরিবারের সদস্যরা গ্রামের কারও সঙ্গেও মিশে না। বাড়ির বাহিরেও তেমন বের হয় না বলে স্থানীয়রা জানায়।