কোন অপ্রাপ্তির যন্ত্রনা নীরবেই এমন ভয়ংকর ঘাতক হলো ক্যম্পাসের সব’চে আত্মবিশ্বাসী মৈত্রীর জীবনে ?

ঢাবি প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর-

আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গনে জানাযার আনুষ্ঠানিকতার পর গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়েছে ঢাবির মেধাবী শিক্ষার্থী আফরা আনিকা মৈত্রীর (২১) ।

এর আগে গত ৭ই মার্চ মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ১২টা থেকে ১টার মধ্যে যে কোনো সময়ে  গলায় ওড়না পেঁচিয়ে  ঘরের সিলিঙয়ে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএলটি ১২ গ্র্যাজুয়েট ও বিবিএলটি জুনিয়র ৮ এর ফ্যাসিলিটেটর অনিকা মৈত্রী। পরে  মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ির মালিকের কাছে সংবাদ পেয়ে পূর্ব তেজতুরি বাজারের একটি বাসা থেকে মৈত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ।

দ্রুতই অর্পার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পরলে অর্পার লাশ দেখতে ভীড় বাড়ে বন্ধু স্বজনদের। অর্পার বন্ধুদের কাছে অর্পার মৃত্যুর কারন জানতে চাইলে বেশ কজন বন্ধু সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানায়, অর্পা দারুন হাসি-খুশি একটা মেয়ে ছিলো! বিস্ময়ের চোখে সকলেই প্রায় একই কথা জানান, ‘সবাইকে যে মেয়েটা মাতিয়ে রাখতো সে কিভাবে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে?’

মৈত্রীর আকস্মিক এমন ভয়ানক সিদ্ধান্ত ও আত্মহনের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেনা তার বন্ধুরা। মঙ্গলবার বিকেল থেকেই মৃত্যুসংবাদ শোনার পর ফেসবুকের টাইমলাইনে মৈত্রীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনার সাথে বিস্ময় প্রকাশও করেছেন মৈত্রীর শত শত পরিচিত বন্ধু ও স্বজনেরা।

দারুন হাসিখুশি , সামাজিক, বিনয়ী এবং নিজের ওপর প্রচন্ড অাত্ববিশ্বাসী মৈত্রীর  কি এমন অভিমান ছিলো যার কারণে সে নিজের সব স্বপ্নকে নিজেই হত্যা করলো? সে প্রশ্ন আর রহস্যের জট খুলছেনা। ‘

এতো হাসি-খুশি মানুষের মনে এতো কষ্ট -অভিমান থাকতে পারে? যার কারনে ‘ইচ্ছামৃত্যু’ !  সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের চোখে-মুখে এখনও সেই প্রশ্ন আর বিস্ময়ের ঘোর।

মৈত্রীর বন্ধু রায়হান খন্দকার নিচের ছবিরা সাথে দেয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন,

” ছবিটি জানুয়ারি ২০১৫ তে তোলা। যে মেয়েটা স্পিচ দিচ্ছে বলা যায় ও পোডিয়ামের প্রথম মেয়ে ফিয়ারলেস স্পীকার ! Afra Anika Moitree
ওইদিন থেকে পরিচয় তারপর ক্র্যাস কোর্সও দেখা হয়েছিল।
আমরা ২ জন অ্যাপল আর অ্যাডোব ফ্ল্যাশ নিয়ে একটা কেস স্টাডি নিয়ে ডিবেট করছিলাম!
আজ অফিসে বসে হঠাৎ যখন নিউজফিডে দেখলাম ও আর নেই বিশ্বাস হচ্ছিল না! She was really a strong girl!
Don’t know how much pressure went through her! 🙁
বেহেশত নসীব করুক! বাবা মাকে ধৈর্য ধরার সামর্থ্য দিক!! 🙁
আর কেউ প্লীজ এমন কিছু করার কথা চিন্তা করবা না। 🙁
Atleast বাবা মা এর কথা চিন্তা করে এটা করবা না। 

Afra-Anika-Moitree

আরিফ নেয়াজ লিখেছেন,

Afra Anika Moitree
তুই এই ভীতুর মতো কাজটা করে আমাকে একা রেখে চলে গেলি…কেউ এখন আর সকালে ফোন দিয়ে বলবে না “এ কালিয়া কোই তুই”…আমার লেম লেম অশ্লীল জোকগুলা শুনে “তুই একটা শয়তান,কুকুর” বলার মতো আর কেউ থাকলো না…পড়াশোনা করি না বলে এখন আর আমাকে কেউ বলবে না “ভাই পড়তে বস”… যতোদিন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবো তোকে আমি খুব,খুব,খুব বেশি মিস করবো বোন…
আল্লাহ তোকে জান্নাতবাসী করুক…

মৈত্রীর সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারনা মিলবে রোকেয়া রাহিমার দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। বন্ধুর মৃত্যুতে শোকাতুর রাহিমা তার দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া আর স্মৃতিচারনে লিখেছেন,

সারাক্ষণ যে মেয়ে চারপাশের সবাইকে হাসি খুশিতে মাতিয়ে রাখতো সে কীভাবে অাত্মহত্যা করতে পারে তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারতেছিনা।ওর অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিলো।সেই স্বপ্নের কথা সবাইকে বলে বেড়াতো।অাইবিএ পড়বে-উদ্যোক্তা হবে,ঢাকা মেডিকেলে পড়ুয়া বড় বোনের চেয়ে বড় হবে ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক -সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় উপস্থিতি ছিলো অামার এই বান্ধবীর।

সদা হাস্যোজ্জ্বল,সামাজিক, বিনয়ী এবং নিজের ওপর অত্যন্ত অাত্ববিশ্বাসী এই ফ্রেন্ডের কি এমন অভিমান ছিলো যার কারণে সে নিজের সব স্বপ্নকে নিজেই হত্যা করলো কিছুতেই বুঝতে পারতেছিনা।কোনোদিন বুঝিনি তুর মতো এতো হাসি-খুশি মানুষের মনে এতো কষ্ট -অভিমান থাকতে পারে। এভাবে চলে না গেলেও পারতি। নিজের ওপর তর সবসময় অনেক অাত্ববিশ্বাস দেখতাম।

কলেজ জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ও অামার খুব ঘনিষ্ঠ ফ্রেন্ড ছিলো।ও অামাকে Rock নাম দিয়েছিলো এবং Rock নামেই ডাকতো।খুব কাছ থেকে ওর সবকিছু দেখার সুযোগ হয়েছে।মহসিন কলেজের পাহাড় বেয়ে কমার্স বিল্ডিংয়ে যাওয়ার সময় প্রথম যে পরিচয় পরিচয় তা দিন দিন ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

কলেজের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে অানোয়ার স্যার এবং এমদাদ স্যারের কাছে একসাথে অ্যাকাউন্টিং প্রাইভেট পড়া,HSC পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য Preparation coaching সেন্টারে একসাথে পড়ার সুবাধে ওর ভেতর বাহির অনেক কিছু জানা ছিলো।বলতে গেলে কলেজের কোনো ফ্রেন্ডের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি ওর সাথেই দেখা ও কথা হয়েছে। প্রাইভেট শেষে জামালখান রোডে হাটতে হাটতে অার রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে করতে ওর স্বপ্নের কথা অার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনতাম।ও প্রতিদিন নতুন নতুন কিছু ইংরেজি শব্দ শিখতো এবং অামাকে ও তা শিখায়তো।এ সুযোগে অামার নিজের ও অনেক জানা হয়েছে।পারিবারিক এবং নিজের অনেক পজিটিভ নেগেটিভ কথা বলতো কিন্তু যতো সমস্যায় পতিত হোক ওকে হতাশ হতে দেখিনি।এতো তাড়াতাড়ি নিজের জীবনের শেষ পরিণতি ডেকে অানবে তা কখনো ভাবেনি।

কিন্তু তারপরও কীভাবে যে এতকিছু হয়ে গেলো তা মানতে পারতেছিনা।কেনো এতো তাড়াতাড়ি নিজের জীবনের সমাপ্তি টানলি!সব সমস্যার সমাধান অাছে।তাই বলে মৃত্যু!!

Your absence can’t change your surroundings but your presence can change it.

তোর সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে অাছে।সবকিছু এখানে লিখা সম্ভব না।এসব কখনো ভুলার না।তুকে কখনো ভুলা যাবেনা।

মৈত্রী,তুই যেখানেই অাছিস ভালো থাকিস।
Rest in peace “Afra Anika Moitree“.
#Afra_Anika_Moitree

Afra-Anika-Moitree22

তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন অর্পার পরিবারিক সূত্রের বরাতে জানায় অর্পা নোয়াখালী জেলা সুধারাম উপজেলার মাইজদী কোর্ট গ্রামের মোশারফ হোসেনের সন্তান ।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে যে কোনো সময় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মেয়েটি ফাঁস দেয়। আমরা সংবাদ পেয়ে তার মরদেহ শায়িত অবস্থায় উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছি।

Save