হাতিরঝিলের আদলেই এবার রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকে নির্মাণ হচ্ছে আটটি সেতু

নিউজ ডেস্ক,সময়ের কণ্ঠস্বর ~  ইট-কাঠের নগরীতে নান্দনিক সৌন্দর্য ও প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা বলতে এখন হাতিরঝিলকেই বোঝেন ঢাকাবাসী। এই হাতিরঝিলের আদলেই এবার রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের ওপর আটটি সেতু নির্মাণ হচ্ছে। নগরবাসীর বিনোদনের জায়গাটা আরও বড় হচ্ছে বটে।

এই ৮ নান্দনিক সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছিল। তবে কোথায় হবে এবং কতোখানি দৈর্ঘ্য বা কেমন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত এতোদিন ঝুলে ছিলো। এবার চূড়ান্ত রুটই নির্ধারণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ সংক্রান্ত ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্পটি সংশোধন করে সেখানে চূড়ান্ত রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।

hatir jhil

সংশোধিত প্রকল্পটি এরইমধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠিয়েছে রাজউক। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় আলোচনার পর আটটি সেতু নির্মাণের রুট চূড়ান্ত হয়।

সূত্রমতে, প্রকল্পের আওতায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, বাড্ডা, শাহজাদপুর ও নিকেতন এলাকায় আটটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ১০০ ফুট। রুট আটটি হলো, মহাখালী থেকে গুলশান-১, মহাখালী থেকে টি অ্যান্ড টি কলোনি, কাকলী থেকে গুলশান-২, কাকলী থেকে গুলশান-২ নম্বর, গুলশান-২ থেকে বারিধারা, গুলশান-২ থেকে বাড্ডা, গুলশান থেকে শাহজাদপুর ও গুলশান থেকে কাঁলাচাদপুর।

এ প্রকল্পের আওতায় হাতিরঝিলের সঙ্গে পুরো গুলশান-বারিধারার একটি যোগাযোগ বা লিংক তৈরি হবে। ফলে ওয়াটার ট্যাক্সি হাতিরঝিল থেকে শুরু করে গুলশান ও বারিধারা পর্যন্ত চলতে পারবে। এতে কারওয়ান বাজার-মগবাজার-সাতরাস্তা-রামপুরা এলাকা থেকে নগরবাসী জলপথে হাতিরঝিল হয়ে বনানী-বারিধারা পর্যন্ত চলাচল করতে পারবেন।

এ প্রকল্পের আওতায় যেমন নান্দনিক সেতু তৈরি হবে, তেমনি জলাশয়ের পানির গুণগত মান বাড়াতে সোলার অ্যাকুয়েটিকস ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি জলাশয়ের পাশের পার্ক ও খেলার মাঠও উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় কড়াইল এলাকায় বস্তিবাসীর জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রও নির্মাণ করা হবে। আটটি সেতুর ওপরই থাকবে লুপ (সেতুর ওপর গাড়িকে ঘোরানোর ব্যবস্থা)।

প্রকল্প সূত্র মতে, আটটি সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ইউটিলিটি স্থানান্তর বাবদ তিন কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

আটটি সেতু নির্মাণের জন্য এসব রুটে ক্যাবল বিভাগ, বহিঃর্বিভাগ এবং অপটিক্যাল ফাইবার ইউনিট থেকে বিটিসিএল এর ভূ-গর্ভস্থ ক্যাবলও স্থানান্তর করা হবে। এর পাশাপাশি ক্যাবল রুট, ক্যাবল ডাক্ট ও ম্যানহোলও সরিয়ে নেওয়া হবে নিরাপদ দূরত্বে। সেতু নির্মাণ শেষে এগুলো পুনঃস্থাপন করার জন্য সম্ভাব্য ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।

‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প’র পরিচালক (পিডি) আমিনুর রহমান  বলেন যে,, গুলশান-বারিধারা লেকে আটটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্যেঁ, করা হবে। সেতুগুলোর ওপরেই থাকবে লুপ। ফলে সেতুর ওপরে যানবাহন টার্ন নিতে পারবে। নগরীর জটলাও অনেকাংশে কমে আসবে। সেতুগুলো এমনভাবে নির্মিত হবে যাতে পুরো হাতিরঝিল, গুলশান ও বারিধারার মধ্যে একটি যোগাযোগ তৈরি হয়। লেকের স্থান দখলমুক্তসহ আরও অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। লেকের পানি বাড়াতেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, হাতিরঝিলের পাশেই হতে চলেছে আরেকটি নান্দনিক বিনোদন কেন্দ্র। যেভাবে হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, ঠিক সেভাবে এ প্রকল্পেরও বাস্তবায়ন কর‍া হবে। হাতিরঝিলের মতো গুলশান লেকেও ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে। হাতিরঝিলের প্রত্যেকটি পয়েন্ট থেকে ওয়াটার ট্যাক্সিতে গুলশান-বারিধারা যাতায়াত করা যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সংশোধিত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। তবে, কমছে কেবল ভূমি অধিগ্রহণ। আগে ৮৬ দশমিক ৪২ একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা থাকলেও এখন অধিগ্রহণ করা হবে ৮০ দশমিক ১০ একর।

রাজউক সূত্র জানায়, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপর ব্যয় বাড়ানো না হলেও মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। এবারের সংশোধিত ডিপিপি’তে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ৪৮৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদই ব্যয় হবে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত।

সেতু ছাড়াও প্রকল্প এলাকায় মানুষের হাঁটা-চলার ২৪ হাজার ৬২২ দশমিক ১৬ মিটার রানিং মিটার ওয়াকওয়ে এবং ১১ হাজার ৬৪ মিটার ড্রাইভওয়ে নির্মাণ করা হবে। এছাড়া দেড় হাজার রানিং মিটার তীর সংরক্ষণ, ৬৯ হাজার ৬১ বর্গমিটার টার্ফিং ও ২ হাজার ৪৮০ মিটার ড্রেনেজ লাইন নির্মাণ করা হবে। রোপণ করা হবে ৩ হাজার বৃক্ষ।

প্রকল্পের আওতায় গুলশান লেক এলাকায় ২ দশমিক ১০ একর আয়তনের পার্ক গড়ে তোলা হবে। নির্মাণ করা হবে ২ হাজার মিটার ওয়াল। স্থাপন করা হবে ২২ হাজার ১১৮ রানিং মিটার আরসিসি পাইপ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে ঢাকা শহরের চারিদিকে সৌন্দর্যবর্ধন করা এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।