অবশেষে সাঁওতালপল্লিতে আগুন লাগানো দুই পুলিশ চিহ্নিত

সময়ের কণ্ঠস্বর – গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকলের বিরোধপূর্ণ জমিতে সাঁওতালপল্লিতে আগুন লাগানোর ঘটনায় দুই সদস্যকে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এ দুজন হলেন- এস আই মাহবুবুর রহমান ও কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণাদেব নাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি এ প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

ভিডিওতে দেখা গেলেও,আগুন লাগানোর অভিযোগ বরাবর নাকচ করে আসছিল পুলিশ। তবে হাইকোর্টের আদেশের পর অবশেষে দুই পুলিশ সদস্যকে তারা সনাক্ত করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাইবান্ধা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই মাহবুবুর রহমান ও গাইবান্ধা পুলিশ লাইনসের কনস্টেবল মো. সাজ্জাদ হোসেন সাঁওতালদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করেছেন বলে পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সাঁওতালপল্লিতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে গোবিন্দগঞ্জের চামগাড়ীতে দায়িত্বরত সকল পুলিশ সদস্যকেও প্রত্যাহার করতে বলা হয়। এই আদেশও বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ৩০ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালপল্লিতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কিছু সদস্য জড়িত মর্মে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

এফিডেভিট আকারে হাইকোর্টে ৬৫ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন দাখিল করেন গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল্লাহ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানোর ঘটনার জন্য স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি এবং উক্ত ঘটনার সময়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য দায়ী। এই আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গে দুই জন পুলিশ সদস্য ও একজন ডিবি সদস্য সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

sawtal-police

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রদর্শিত ভিডিও ক্লিপ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, কিছু পুলিশ সদস্য এবং দুজন সিভিল পোশাকধারী ব্যক্তি সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানোয় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। আরো কিছু পুলিশ সদস্য কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন যারা আগুন লাগানোয় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেননি। তবে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চামগাড়ী বিল ও কুয়ারমারা নামক স্থানে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে। সাহেবগঞ্জ ও হরিণমারী এলাকায় আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে সন্ধ্যা ৭টার পরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এবং হাজার হাজার জনতার উপস্থিতি দেখে বসতি স্থাপনকারীগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আগুন লাগানোর পূর্বেই নির্মিত স্থাপনা থেকে অনুমান ৫০০/৬০০ গজ দূরে মাদরপুর ও জয়পুরগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল মর্মে সাক্ষীদের বক্তব্যে সুস্পষ্ট হয়েছে। ফলে এরূপ প্রেক্ষাপটে সাক্ষীগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িত স্থানীয় অপরাধীদের সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করতে পারেননি। তা ছাড়া কোনো কোনো সাক্ষী তাদের জবানবন্দিতে আগুন লাগানোর ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেও তাদের উপস্থিতির বিষয়টি বর্ণিত প্রেক্ষাপটে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ পোশাক পরিহিত থাকায় সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগানোর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের গুলির আওয়াজে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সাঁওতালরা তাদের স্থাপনা ছেড়ে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে গ্রুপটি খামারের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করেছিল তারাই চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের নির্মিত স্থাপনার নিকট গমন করেছেন। পেন ড্রাইভে প্রদত্ত ভিডিও ক্লিপসূমহ পর্যবেক্ষণে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল ও মসুলমান সাক্ষীদের পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চামগাড়ী বিল নামক স্থানে নির্মিত স্থাপনা থেকে সাঁওতালগণ চলে যাওয়ার পর আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবির পোশাক পরিহিত সদস্য এবং সাধারণ পোশাকধারী দুই জন ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ওই গ্রুপটির মধ্য হতে পুলিশ লেখা পোশাকধারী দুজন, ডিবি লেখা পোশাকধারী একজন ও সাধারণ পোশাকধারী দুজন (লাল ও সাদা রং এর শার্ট পরিহিত) ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। অপরদিকে কুয়ামারা, সাহেবগঞ্জ ও হরিণমারী এলাকায় সাঁওতালদের নির্মিত স্থাপনায় কতিপয় স্থানীয় জনতা আগুন লাগিয়েছে।

গত ১৪ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালপল্লিতে অগ্নিসংযোগে পুলিশ জড়িত কি না, সে বিষয়ে তদন্তের জন্য গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

ওই নির্দেশ মোতাবেক গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনার তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।