বাংলাদেশের ডেন্টিস্ট্রি

মোঃ গোলাম আরাফাত নিলয়, মুক্তমত, সময়ের কণ্ঠস্বর: চেষ্টা করছি সব রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের এই প্রফেশন নিয়ে একটি পোস্ট দেয়ার । যদিও বিরাজনীতিকরনও রাজনীতির একটি অংশ; তবে সে অন্য গল্প । এছাড়াও বেশ কিছু রাজনৈতিক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বিভ্রান্তিকর কথা বলে থাকেন; সাথে সাথে আত্মমগ্নতায় ব্যাস্ত থাকেন; তাই ওইদিকে আর যাচ্ছি না । বেশ কিছু গঠনমূলক সমালোচনা থাকবে, সম্ভাবনা লেখার চেষ্টা করছি । অবশ্যই আমার বয়সী একজনের চোখ থেকে । কারন আমি যেভাবে ভাববো আমার একজন প্রফেসর নিশ্চয়ই সেভাবে ভাববেন না, আমাদের ভাবনাগুলোর মাঝেখানে নিশ্চয়ই মৌলিক কিছু পার্থক্য থাকবে ।

সম্ভাবনাঃ
সম্ভাবনার কথা হচ্ছে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হচ্ছে ১৬ কোটি ৬৪ লাখের কিছু বেশী (world0meters) । BMDC এর ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের রেজিস্টার্ড ডেন্টিস্ট এর সংখ্যা মাত্র ৬৮০০ জন । উইকেপিডিয়াতে দেখলাম বাংলাদেশে ডেন্টাল কলেজ আছে ২৪ টি, আর একটি ওয়েবসাইটে দেখলাম সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ৩৩ টি । প্রতি বছর গড়ে ৬০ জন করে ভর্তি হলে এবং গড়ে ৪৫ জন করে পাশ করালেও আজ থেকে ২০ বছর পরেও বাংলাদেশের ডেন্টিস্ট এর সংখ্যা ৫০,০০০ এর উপরে হবে না । এতো বড় জনসংখ্যার এই দেশে জব (চাকরি)হিসেবে ডেন্টিস্টদের অবস্থান অনেক উপরে হওয়া উচিৎ, একজন নতুন পাশ করা ডেন্টিস্ট নিজের শখ পূরণ করে (সুন্দর জামা কেনা, ভালো কিছু খাওয়া) বাবা মায়ের জন্য কিছু টাকা পাঠাতে পারেন ।

বর্তমান অবস্থাঃ
সাধারণত গ্রাজুয়েশন শেষ করে একজন ডেন্টিস্ট যা করতে পারেঃ
১। উচ্চতর পড়াশুনা
২। বিসিএস/ অথবা যেকনো প্রতিষ্ঠানে চাকুরি
৩। কোন সিনিয়র ডেন্টিস্ট এর চেম্বারে কাজ করা
৪। পর্যাপ্ত অর্থ, ট্রেইনিং থাকলে নিজে চেম্বার দেয়া
৫। জেলা শহর, থানা শহর বা যেকোনো উপশহরে প্র্যাকটিস করা
৬। লাইসেন্স পরীক্ষা দিয়ে দেশের বাহিরে চলে যাওয়া
৭। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়াশুনা করে এই সম্পর্কিত এনজিঅ/প্রতিস্থানে চাকুরি করা
৮। ম্যাজিস্ট্রেট/ জরিমানা এর ভয়ে ভীত কোন কোয়াক এর চেম্বারে ১/২ ঘণ্টা করে সময় দেয়া ।

arafat niloi

মোঃ গোলাম আরাফাত নিলয়
বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ
২০০৭-২০০৮ সেশন
বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নংঃ ৬৬৩১

 

বাংলাদেশে উচ্চতর পড়াশুনার জন্য কোথাও চান্স পাওয়া বেশ কঠিন । ব্যাপারটা দেখলে মনে হয় আমাদের সমাজব্যাবস্থা মনে করে আমরা শুধু গ্রাজুয়েশন করার যোগ্যতা আছে, কিন্তু এর চেয়ে বেশী পড়াশুনা করার যোগ্যতা আমাদের নেই । সাথে আছে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের সিটের হতাশাজনক অপ্রতুলতা । এর পিছনে কারন হতে পারে হয়তো আমাদের গ্রাজুয়েশন এর কারিকুলামে সমস্যা আছে যার কারনে আমরা পোস্টগ্রাজুয়েশন এর জন্য যথেষ্ট দক্ষ (!) হচ্ছি না ।

বিসিএস বা যেকোনো সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বছরে মাত্র ১০০ টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হলেও সেটা বিশাল ব্যাপার বলে আমরা গণ্য করতে পারি, কারন বিগত বেশ কিছু বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে ১০০টি পদও খালি হয় না ।
বেসরকারি বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানে মাঝে মাঝে নিয়োগ দেয়া হয়, এইসব নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমেই হয় । দুঃখের কথা হচ্ছে এসব নামকরা কিছু প্রতিষ্ঠানের আয় মাসেই কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যায়, কিন্তু ডেন্টিস্টদের বেতন দেয়ার বেলায় ১৫,০০০ টাকাই অনেক সম্মানজনক বলে মনে করা করা হয় ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের বেশ কিছু নামকরা প্রাইভেট ডেন্টাল কলেজ সমূহে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, এসোসিয়েট প্রফেসরগণ মাত্র ১৫,০০০-২০,০০০ টাকায় চাকুরি করেন । এমনকি লেকচারাররা মাত্র ৩০০০ টাকায় চাকুরি করেন এমন নজির আছে, কিছু কিছু কলেজ নাকি ৪৫ দিনে মাস হিসেব করে বেতন দেন । সুতরাং অবস্থা যে কি ভয়াবহ তা বোঝাই যাচ্ছে ।

কোন সিনিয়র ডেন্টিস্ট এর চেম্বারে কাজ করার ক্ষেত্রে সদ্য পাশ করা ডেন্টিস্টরা ২০০০ টাকা থেকে শুরু করে  ৮০০০ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন, এর বেশী কেউ যদি পান তাহলে তাকে নিয়ে বাকি সবাই প্রচণ্ড ঈর্ষা অনুভব করলে আমি অন্তত দোষের কিছু দেখি না ।
তবে এফসিপিএস/এমএস/ অথবা এমন কোন ডিগ্রি থাকলে যেসব চেম্বারে ৫০ লাখের উপরে আয় হয়, সেসব চেম্বার থেকে ২০,০০০/২৫,০০০ টাকা বেতন দিতে পারে ।

জনস্বাস্থ্যে ইদানিং পড়ার প্রবণতা বেশী দেখা যাচ্ছে । এখান থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে কিছু ক্ষেত্রে ভালো টাকা আয় করা যায়, সমস্যা হচ্ছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে চাকরিগুলো প্রজেক্টভিত্তিক হয় । যেহেতু পার্মানেন্ট চাকুরি না তাই এক্ষেত্রেও সমস্যা থেকে যায় ।

বাংলাদেশের বিডিএস ডিগ্রি বেশীরভাগ দেশে স্বীকৃত না হওয়ার কারনে দেশের বাইরে গিয়ে কোন চাকুরি করা বা প্র্যাকটিস করাও অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার ।

প্রচণ্ড অন্ধকার গুহার মধ্যে এক চিলতে আলোর মতো একটু সম্ভাবনা হচ্ছে যদি কমপক্ষে ৫ লক্ষ টাকা থাকে, পর্যাপ্ত যোগাযোগ থাকে, এবং জেলা শহর, থানা শহর বা যেকোনো উপশহরে থাকার মানসিকতা থাকলে এবং অবশ্যই কমপক্ষে ১/২ বছর পরিবার থেকে ভরন পোষণের সহায়তা পাওয়া গেলে তবে নিজে একটি চেম্বার দিলে একটি সংসার চালানোর মতো অর্থ আয় করা সম্ভব হলেও হতে পারে ।

ম্যাজিস্ট্রেট/ জরিমানা এর ভয়ে ভীত কোন কোয়াক এর চেম্বারে ১/২ ঘণ্টা করে সময় দেয়া সম্পর্কে কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না ।

তবে ফেইসবুকে ইদানিং বিভিন্ন শ্রদ্ধেয়ো নেতারা নানাভাবে বলছেন, এই প্রফেশনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসছে । আমিও বড্ড আশা নিয়ে বসে আছি, একদিন ডেন্টিস্ট্রি করে আমার হাত খরচ চলবে, আমি আমার বাবা মাকে সংসার খরচের টাকা দিতে পারবো ।

ব্যাক্তিগত কথাঃ আমি প্রচণ্ড প্ররিশ্রম করতে পারি, তাই ফ্রিল্যান্সিং, বই লেখা, কোচিংএ পড়ানো, টিউশনি করে বেশ কিছু টাকা আয় করতে পেরেছি, এবং এর একটা অংশ আবার ডেন্টিস্ট্রি এর পিছনে খরচ হয়ে গেছে । ডেন্টিস্ট্রি করে এখন পর্যন্ত আমি মাত্র ৫০০ টাকা আয় করতে পেরেছি ।

লেখাটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে তাই এখানেই শেষ করছি, পরের অংশে ডেন্টিস্টদের মানসিকতা, কমনসেন্স, স্মার্টনেস, কোয়াক সমস্যা এসব নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আসে ।

(লেখাটার যেকোনো সমালোচনা, মতামত এমনকি আমাকে ব্যাক্তিগত আক্রমণ করতে পারেন । আমি আমাকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করবো, পাল্টা আক্রমণ করবো না)

ফানফ্যাক্টঃ বাংলাদেশের শুধু মাত্র একজন ডেন্টিস্ট আছেন যিনি কোটি টাকার চেয়েও বেশী দামি গাড়ি ব্যাবহার করেন; তবে তিনি কোন রাজনীতি করেন না 😛 😛 (শোনা কথা)