বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে ঝড়

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্কঃ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যগুলোর আড়ি পাতার তথ্য ফাঁস করে দেয় উইকিলিকস। বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে ঝড় তুলে দেয় বিষয়টি। এ নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব পণ্যের নিরাপত্তা দুর্বলতা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। খবর বিবিসি।
উইকিলিকসের অভিযোগ সিআইএর বিরুদ্ধে, স্মার্টফোন ও স্মার্টটিভির মাধ্যমে জনগণের ওপর নজরদারির পন্থা উদ্ভাবন করেছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। এর প্রমাণ হিসেবে মঙ্গলবার সিআইএর ব্যবহৃত বিভিন্ন হ্যাকিং টুল ও জনগণের ওপর নজরদারিতে এগুলোর ব্যবহারিক পদ্ধতি বর্ণনা করে হাজারেরও বেশি নথি ফাঁস করে উইকিলিকস। পণ্যগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সিআইএর নজরদারির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবিয়ে তোলে। আলাদা আলাদা বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রথমবারের মতো নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দিয়েছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত আইফোনের গ্রাহকদের কথপোকথনে আড়িপাতার অভিযোগ উঠেছে সিআইএর বিরুদ্ধে। বিবৃতিতে আইফোনের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে অ্যাপল। এ ধরনের বেশকিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাপল। এর পরও তথ্য সুরক্ষার দিক থেকে অ্যাপলই এখন পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যাপলের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এখনকার আইফোনে ব্যবহূত প্রযুক্তি গ্রাহকদের জন্য সর্বাধিক তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম এবং আমরাও একে আরো উন্নত করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। আমাদের পণ্য ও সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে এগুলো দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট গ্রহণে সক্ষম হয়। আমাদের গ্রাহকদের ৮০ শতাংশই এখন সবচেয়ে হালনাগাদ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছেন।’ এতে আরো বলা হয়, ‘প্রাথমিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যেসব ইস্যু এখন সামনে উঠে এসেছে; আইফোনের সর্বশেষ ভার্সনটিতে সেগুলো এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে। এ ধরনের কোনো দুর্বলতা সামনে আসামাত্রই আমরা তা সমাধানের সর্বোচ্চ প্রয়াস নেব। গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য আমরা নিয়মিতই আইওএসের সবচেয়ে হালনাগাদ ভার্সন ও সিকিউরিটি আপডেট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকি।’ উইকিলিকসের দাবি, স্যামসাংয়ের এফ৮০০০ সিরিজের স্মার্টটিভির মাধ্যমেও গ্রাহকদের ওপর নজরদারি চালিয়েছে সিআইএ। এজন্য ব্যবহূত হয়েছে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ভাবিত ইউএসবি কানেকশনভিত্তিক হ্যাকিং টুল। এ বিষয়ে স্যামসাংয়ের ভাষ্য হলো, ‘স্যামসাংয়ের কাছে বরাবরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ভোক্তাদের গোপনীয়তা ও ডিভাইস নিরাপত্তার নীতি। আলোচ্য বিষয়টি (উইকিলিকসের নথি) এরই মধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছি আমরা।’ ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারী কম্পিউটারেও সিআইএর নজরদারির অভিযোগ তুলেছে উইকিলিকস। এ বিষয়ে মাইক্রোসফটের এক মুখপাত্র জানান, ‘বিষয়টি এরই মধ্যেই আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরাও বর্তমানে এটি সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।’ এদিকে লিনাক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমে পরিচালিত কম্পিউটারগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য সিআইএ ‘অ্যাটাক অ্যান্ড কন্ট্রোল’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছে বলে ফাঁস করা নথিতে জানিয়েছে উইকিলিকস। এ বিষয়ে লিনাক্স ফাউন্ডেশনের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিকো ভ্যান সোমেরেনের বক্তব্য, ‘অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে বিশ্বব্যাপী লিনাক্সের জনপ্রিয়তা অনেক। সুতরাং বিভিন্ন ক্লোজড সোর্স প্লাটফর্মের পাশাপাশি লিনাক্সের ওপরও যে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার নজর থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু র্যাপিড রিলিজ সাইকেল বা দ্রুত হালনাগাদ সংস্করণের মাধ্যমে এ ধরনের দুর্বলতা দূর হয়ে যায়, ফলে গ্রাহকও দ্রুত এ ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেন। নিজস্ব উদ্ভাবিত ‘জিরো ডে’ বাগ ব্যবহারের মাধ্যমে সিআইএ যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে আড়ি পাততে সক্ষম বলে দাবি করেছে উইকিলিকস। অপারেটিং সিস্টেমের ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকের ফোনকলে আড়িপাতা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট যেকোনো তথ্য সংগ্রহের কাজে এ ধরনের বাগ ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি অ্যান্ড্রয়েড ওএসের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুগল। অন্যদিকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছ থেকে দ্রুত ও সবিস্তার ব্যাখ্যা দাবি করেছে ইন্টারনেট ব্যবহারে গোপনীয়তা ও সুরক্ষার বিষয়ে সোচ্চার দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশন। ‘বিভিন্ন দেশের সরকারের কাজ হলো নাগরিকদের ডিজিটাল গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সুরক্ষা দেয়া। কিন্তু সিআইএর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা এর বিপরীত দিকেই নির্দেশ করছে। টিভি ও স্মার্টফোনের মতো পণ্যগুলোকেও অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে সংস্থাটি। এসব পণ্যের নিরাপত্তা দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করার পর তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে না জানানোর বিষয়টি একই সঙ্গে বিপজ্জনক ও অদূরদর্শী। এসব অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে আমরা ট্রাম্প প্রশাসনসহ অন্যান্য দেশের সরকারের কাছে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’