সাগর দুয়ারে এ কার হাতছানি

ছোট গল্পঃ  পেনাং। মালয়শিয়া।রাত তিনটা একান্ন। বাটারফ্লাই গেস্ট হাউস। বাতু ফিরিঙ্গি। গেস্ট হাউসটা ছোট। ছিমছাম। ঘরোয়া। রুম খুব কম। মনে হচ্ছে নিজ দেশের গ্রামের বাড়ি এসেছি। গেস্ট হাউসের সামনে দিয়ে গ্রাম্য সরু পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে। হাউসের সম্মুখের রাস্তাটার অপর পারে সাগর সৈকত। সৈকতে সাগরের ঢেউ আছড়ে পরার শব্দ। শোঁশোঁ। একটা গাড়ি ছুটে গেলো। একটা কুকুর ডেকে উঠলো। খানিক বিরতি দিয়ে কুকুরটা আবার ডাকছে। ইলেক্ট্রিক বাতি জ্বলছে চারদিকে। তারপরেও খানিকটা গুমোট ভৌতিক আঁধার। আমি বাটারফ্লাই গেস্ট হাউসের গেট ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। সামনে সাগর সৈকত। মনে বাতু ফিরিঙ্গি নামটা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাতু অর্থ পাঁথর। মালয়রা সেম্বলিক হিসেবে ব্যাবহার করে অঞ্চল বুঝাতে। আর ফিরিঙ্গির অর্থ বিদেশি হলেও মূলত পর্তুগিজরা ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত ছিলো। তারা এই অঞ্চলে এসেছিলো মসলা’র ব্যাবসা করতে। শুরুতে ব্যাবসা দিয়েই শুরু করেছিলো। ইউরোপ থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া আর দক্ষিণ এশিয়ার জলপথে তাদের একছত্র রাজত্ব থাকার জন্য তারা ক্রমে হয়ে উঠেছিলো বেপরোয়া। সুযোগ পেলেই অন্য জাহাজে তারা আক্রমণ করতো। লুঠ করতো অর্থকড়ি। মসলা। কখনো মানুষ। তাদের দিয়ে টানাতো জাহাজের লগি। অথবা বিক্রি করে দিতো দাশ হিসেবে নিলামে। প্রকৃত জলদস্যুর কাজ। তাই ফিরিঙ্গি শব্দটা হয়ে উঠেছে জলদস্যু’র সমর্থক শব্দ। ফিরিঙ্গি জলদস্যু। ফিরিঙ্গিদের আনাগোনা এই পেনাং দ্বীপে প্রচুর ছিলো। হয়তো ছিলো এই সৈকতে তাদের পথ বিরতির স্থান। আশপাশ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতো। হয়তো বন্দীদের এই সৈকতেই এনে জমায়েত করতো। নিলাম তুলতো। মদ খেয়ে হুল্লোর করতো। তীরে রাখা একটা বেঞ্চিতে এইসব ভাবতে ভাবতে এসে বসেছি। সামনে সাগর। ঢেও আছড়ে পড়ছে তীরে। দূরে দুটি আলোকিত জাহাজ ভাসছে অন্ধকার কালো সাগরে। বিন্দু আলোর মতো দেখাচ্ছে। জলদস্যুদের জাহাজ গুলো হয়তো এমনটা করেই বিন্দুর মত এই সৈকত থেকে দেখা যেতো। আকাশে মেঘ। তারা নেই। ঘন অন্ধকার। বাঁ দিকের তীর ধরে সৈকত এগিয়ে হারিয়েছে তিনটা কালো পাহাড়ের আড়ালে। তাদের অবয়ব আঁধারেও স্পষ্ট। তারপর কেন যেন ভাবনার ছেদ পড়ল। সাগরের শোঁ শোঁ ছাপিয়ে সৈকতের অন্ধকার কোণা গুলো আকর্ষণ করছে। গা ছমছম করা আকর্ষণ। জনমানুষ নেই। ডেকে চলা কুকুরটাও থেমে গেছে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি চারটা বিয়াল্লিশ। আচমকা চোখের কোণ দিয়ে আংশিক দেখলাম কেও একজন আমার ডান পাশ দিয়ে আমাকে ছাপিয়ে সাগরের দিয়ে হেটে চলল। একটা মানবিক অবয়ব। একটা মেয়ে। কাধ আর পিঠ খোলা সাদা রঙের ড্রেস। নগ্ন পা দুটো দেখা যাচ্ছে। হেটে সোজা সাগরের দিকে চলেছে। চৈনিক তরুণী অথবা শ্বেতাঙ্গ হতে পারে। বোঝা যাচ্ছে না। শুধু তরুণীর তরুনীত্ব বুঝা আছে বেশ স্পষ্ট। শেষ রাতে জনশূন্য সৈকতে কোন মেয়ে এইভাবে সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে কেমন যেন অশরীরী মনে হলো। অজ্ঞাত কোন ভয় গ্রাস করে নিলো আমাকে। পিছু ফিরে রাস্তায় চলে এলাম কোন রকমে। রাস্তায় আলো আছে। ল্যাম্প পোস্ট আছে। পেছনেই ছিলো গেস্ট হাউসের গেট। সোজা ওই দিকে চললাম উল্টো ঘুরে। পিছু ফিরে তাকালাম। গেস্ট হাউসের গেটের কাছের আলোতে খানিকটা সাহস হয়েছে। সাহস এবং কৌতূহল। মেয়েটা পায়ে সাগরের ঢেও এসে লুটিয়ে পড়ছে। অপার্থিব দৃশ্য। মেয়েটা গভীর সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ধীর পায়ে। ধীরে ধীরে। গেস্ট হাউসের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দরজা লাগাতে গিয়ে শেষবার তাকালাম সৈকতের দিকে। আবছা আলোতে এইবার মেয়েটিকে একা দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা চলে গিয়েছে বেশ গভীরে। তাকে অনুসরণ করছে আরো কয়েক জন। সৈকতময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এগুচ্ছে। গন্তব্য সাগরের দিকেই। ধীর পায়ে এগিয়ে চলছে। পাচ জন। দুটি মেয়ে। তিনটি ছেলে। মেয়ে দুটির পোষাক দূরে চলে যাওয়া প্রথম মেয়েটার মতোই। সাদা। পিঠ খোলা। ছেলেদের ড্রেসও সাদা। হাওয়াই টি শার্ট গায়ে। ঢিলে ঢালা। বাতাসে উড়ছে বুঝা যাচ্ছে। অজানা কারণে গা শিরশির করে উঠছে আমার। অন্য কোন দিকে দৃষ্টি নেই তাদের। শুধু সামনের সাগরের দিকে। বিন্দু আলোতে জ্বলতে থাকা ইয়োট গুলোর দিকে যাচ্ছে যেন। হাঁটছে। কোমড় পানিতে। আরো সামনে যাচ্ছে। ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। যাচ্ছে। হাটছে। এবং হেটে সবাই সাগরের মাঝে হারিয়ে গেলো। অপেক্ষা করলাম। কেও উঠে এলো না। ভয় পেলাম। প্রচন্ড ভয়। গেস্ট হাউজের দরজা বন্ধ করে ভয়ে টলতে থাকা পায়ে রুমে যাওয়ার আগে দেখলাম রাস্তার একটা ল্যাম্প পোস্টের নিচে ছায়ায় একটা কুকুর বসা। তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

পেনাংয়ে দুই দিন ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও ভোরেই আমি আমার বর্তমান আবাস কুয়ালালামপুর রওনা দিলাম। তিনদিন পর সংবাদ পত্রে নিউজ দেখলাম, অজ্ঞাতনামা ছয় জনের লাশ বাতু ফিরিঙ্গির নিকটবর্তী পাহাড়ের গোঁড়ায় পানিতে পাওয়া গিয়েছে। কারো পরিচয় জানা যায় নি। কোন দেশি সেই ব্যাপারেও কেও নিশ্চিত নয়। ছয় জনের তিনজন তরুন আর তিনজন তরুণী। পুলিশ আশেপাশের সব ধরণের হোটেল মোটেল গেস্ট হাউসে খোঁজ নিয়েছে। গত এক মাসের বুকিং বুকিং নেওয়া কেও নিখোঁজ হয় নি। এমনকি ওই এলাকা বা আশেপাশের এলাকার কোন সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজেও এই ছয় জনকে দেখা যায় নি। নিউজের ছবিতে যে পাহাড়ের ছবি দেওয়া সেটা আমার পরিচিত। আমি যাদের দেখেছিলাম সাগরের দিকে এগিয়ে যেতে ওই পাহাড় তিনটি ছিলো ঠিক তাঁদের বামে সৈকতের শেষ প্রান্ত ধরে। অনেক দূরে।

এক মাস পর। আমি অফিস থেকে এসে দরজা খুলে দেখলাম সাদা একটা পোস্ট কার্ড। ফ্লোরে। ইংরেজিতে লেখা। বাংলায়, ‘চলো। সাগর ডাকছে’।