নিষ্ক্রিয় ৯০ লাখের বেশি ব্যাংক হিসাব

অর্থনৈতিক ডেস্কঃ দেশের সুবিধা বঞ্চিত কৃষকদের ব্যাংকিং সুবিধায় আনতে ২০১০ সালে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। কৃষকদের জন্য চালু করা হয় ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব। শুরুতে জনপ্রিয়তা পেলেও দিন দিন গুরুত্ব হারাচ্ছে এ উদ্যোগ। কৃষকদের জন্য খোলা ৯০ লাখের বেশি ব্যাংক হিসাবের অধিকাংশই লেনদেন না হওয়ায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কাঙ্ক্ষিত হারে সঞ্চয় হয়নি কৃষকদের খোলা এসব ব্যাংক হিসাবে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবে জমা হয়েছে ২২৩ কোটি টাকা, ব্যাংক হিসাবপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ২৪৭ টাকা।

১০, ৫০ ও ১০০ টাকায় খোলা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এর মধ্যে ঠিক কতটি সচল আছে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নেই। তবে এসব হিসাবের অধিকাংশেই যে লেনদেন হচ্ছে না, তা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দেশের ব্যাংকগুলো বিশেষ হিসাব চালু করার তথ্য তিন মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দেয়। কিন্তু কতগুলো হিসাব সচল আছে, সে ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত করা হয়নি। তবে বিশেষ হিসাবে জমা হওয়া আমানতের পরিমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এটি বলা যায়, বিশেষ হিসাবগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশেই লেনদেন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল শেষে দেশের ৫৬টি ব্যাংকে খোলা বিশেষ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৬৭ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে আমানত রয়েছে ১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ১৫৪।
ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনতে আর্থিক সেবাবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে দেশের ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর সুবিধাভোগী হিসেবে রয়েছেন কৃষক, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী, মুক্তিযোদ্ধা, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শ্রমিক, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, চামড়া ও পাদুকা শিল্পজাত কারখানায় কর্মরত শ্রমিক, স্কুল শিক্ষার্থী, কর্মজীবী পথশিশু-কিশোর, আইলাদুর্গত ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী।

সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধার আওতায় ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের ৫৪ শতাংশই খুলেছেন কৃষকরা। কৃষকদের বিশেষ হিসাবগুলোর মধ্যে ১৮ লাখ ৬০ হাজার ২৫৫টি সরকারি ভর্তুকি ও বেতন জমা হওয়ার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া ২০ হাজার ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নকৃত ঋণ দিয়ে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কৃষকদের চালু করা ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৮০ শতাংশে লেনদেন হচ্ছে না বলে জানান ব্যাংকাররা।

অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কারণে বিশেষ ব্যাংক হিসাবের বড় একটি অংশে লেনদেন হচ্ছে না। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ব্যাংকিং ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষ হিসাবগুলো ব্যবহার হচ্ছে।

অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় খোলা হয়েছে ২২ লাখ ১১ হাজার ৯১৭টি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ২৭৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। মুক্তিযোদ্ধারা খুলেছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৯৩টি। এসব ব্যাংক হিসাবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে ২১১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী ৪২ লাখ ৫২ হাজার ৪৭৮টি ব্যাংক হিসাবে ৩৬০ কোটি ১১ লাখ টাকা, খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচির ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৫টি হিসাবে ৬২ কোটি, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ৯ হাজার ৭২১টি ব্যাংক হিসাবে ৪৪ লাখ, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৫টি ব্যাংক হিসাবে ১০০ কোটি ৯৬ লাখ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সব প্রতিবন্ধীর ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৩৮টি ব্যাংক হিসাবে ১৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা জমা হয়েছে।

কর্মজীবীশিশু ও পথশিশুদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ব্যাংকগুলোর প্রতি ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭টি ব্যাংক ১৩টি এনজিওর সহযোগিতায় মোট ৩ হাজার ৭২৫টি হিসাব চালু করেছে। পথশিশুদের এসব ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ২৪ লাখ ১১ হাজার ৭০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে গড়ে ৬৫৫ টাকা। পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব খোলার দিক থেকে শীর্ষে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাসাস ও সাফের সহযোগিতায় ব্যাংকটি ডিসেম্বর শেষে ১ হাজার ৫৭টি পথশিশু ব্যাংক হিসাব চালু করেছে। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ১০ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান মনে করছেন,আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য চালু করা বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাবকে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য বোঝা । তিনি বলেন, এসব ব্যাংক হিসাবের তথ্য রাখা, প্রতিনিয়ত তথ্য হালনাগাদ করা, কাগজে প্রিন্ট করা, কম্পিউটারে ডাটা রাখাসহ সবকিছুর জন্যই ব্যাংকের খরচ হচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যাংক হিসাবগুলোয় সঞ্চয় থাকছে না। তবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা বিবেচনা করে এ কাজগুলো আমাদের করতে হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় একসময় হয়তো এ হিসাবগুলোয় বড় অংকের আমানত সংরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে বিশেষ তহবিল চালু করে ব্যাংক হিসাবগুলো সচল রাখায় সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। তিনি বলেন, দেড় কোটির বেশি প্রান্তিক মানুষকে ব্যাংকগুলো সেবার আওতায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। চালু করা ব্যাংক হিসাবগুলোর কিছু অংশ লেনদেন না করার কারণে অচল রয়েছে।