বিএনপি’র ডাকসাইটে নেতা থেকে কথিত পীর! অতঃপর নৃশংস হত্যার শিকার! নেপথ্যে যত রহস্য

সেতাবগঞ্জ প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর-

সবার চোখে জিজ্ঞাসা,  কেন এমন নৃশংস হত্যার শিকার হলেন কথিত পীর ও তার নারী মুরিদ?

সোমবার রাতে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় কথিত এক পীর ও তার নারী মুরিদকে গলা কেটে ও গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতংক। নিহত পীর বিএনপির সাবেক নেতা ছিলেন । নিহত নারীর নাম রুপালি বেগম (২৩)। তাঁর বাড়িও একই গ্রামে। মুরিদের পাশাপাশি ওই বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজও করতেন। গত বৃহস্পতিবারই শহীদুল ইসলাম নামের এক যুবকের সাথে রুপালী বেগমের বিয়ে হয়েছিলো । শহীদুলও কথিত এই পীরের এক মুরিদ ছিলেন বলে জানা গেছে।

pir-murder
নিহত মুরিদ রুপালী বেগমের লাশ

মাত্র ক’বছর আগেই তিনি ছিলেন বিএনপি’র ডাকসাইটে নেতা। নিজ এলাকায় নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ছিলো ব্যপক অংশগ্রহন। একসময় সেতাবগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি  । দিনাজপুর পৌরসভায় মেয়র পদে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে একবার নির্বাচনও করেছিলেন।তবে বিপুল ব্যবধানে হেরে যান নির্বাচনে।  একইসাথে  দিনাজপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতিও ছিলেন আজকের দিনে নৃশংস হত্যার শিকার কথিত পীর ফরহাদ হোসেন চৌধুরী (৬০)।

কথিত পীর ও তারা নারী মুরিদের হত্যাকান্ডের পর ইতমধ্যে জোর তদন্ত শুরু হয়েছে। আলামত সংগ্রহ করছে সিআইডি’র একটি দল। তবে এখন অবধি মেলেনি কোন ‘ক্লু’। জানা গেছে,বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ । প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে সময়ের কণ্ঠস্বরের সাথে আলাপকালে পুলিশের একটি তদন্ত সুত্র জানায়, ‘ধরন দেখে মনে হচ্ছে ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ তবে  নিহত কথিত পীরের রাজনৈতিক জীবন, ব্যাক্তিগত জীবনে ব্যবসায়িক কোন ঝামেলা অথবা বিরোধ ছিলো কী না ? সে বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে  বলে জানায় ঐ তদন্ত সুত্রটি ।

সময়ের কণ্ঠস্বরের সাথে আলাপকালে প্রতিবেশী  শামসুল মিয়া জানান, ফরহাদ হোসেন চৌধুরী পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গায় থাকতেন। তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সন্তানদের নাম আশিক, এমি ও অর্ণব।

তিনি আরও জানান, ৭-৮ বছর ধরে এই দরবার শরিফটি চলছে। এটি চালাতেন ফরহাদ হোসেন চৌধুরী। সেখানে প্রতিদিন রাতে মুরিদরা আসতেন এবং জিকির করতেন। বিকেলের দিকে ফরহাদ হোসেন শহর থেকে গাড়ি করে দরবার শরিফে চলে আসতেন।

প্রতিবেশীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, প্রায় ৭/৮ বছর আগে নাগরিক জীবনের সবকিছু ছেড়ে আকস্মিক ধর্ম কর্মে মনোনিবেশ করেন ফরহাদ হোসেন চৌধুরী।  সেসময় সবার কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে নিজেকে পীর পরিচয়ই বেশি দিতেন তিনি। লোকজনও তাঁকে সে ভাবেই চিনত। রাজনৈতিক অঙ্গন ও মটর মালিক সমিতিতে নিজের  ভালো অবস্থান থেকেই অনেক শ্রেনী-পেশার মানুষের সাথে সু-সম্পর্কের সুবাদে অল্প সময়েই নিজের বেশ কিছু ভক্ত অনুরাগী তৈরি করে বনে যান কথিত পীর।

প্রতিবেশীরা জানায়, ধীরে ধীরে  ফরহাদ হোসেন বাড়িতে পীরের আখড়া গড়ে তুলেছিলেন। একসময়  বাড়িটি ‘দৌলা দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত হয়ে পড়ে আশেপাশের মানুষদের কাছে । গত কয়েকবছর  ধরে এ কথিত পীরর এই আস্তানায়  সপ্তাহে এক দিন আনুষ্ঠানিকভাবে মুরিদরা ‘জিকির-আজকার’ করতেন।  এ ছাড়াও  প্রায় দিনই  এই আস্তানায় কমপক্ষে শতাধিক মুরিদ ভক্ত জমায়েত হতেন এবং রাতভর চলতো জিকির ।

প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে, আজ জিকির শুরুর আগে আগে, তখনো লোকজন জড়ো হয়নি এমন সময় ৬-৭ জন দুর্বৃত্ত দরবার শরিফে ঢুকে প্রথমে ‘হুজুরকে’  চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে ও গলা কাটে। পরে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় রূপালী বেগম চিৎকার করলে দুর্বৃত্তরা একই কায়দায় তাঁকেও পাশের আরেকটি ঘরে হত্যা করে।

দৌলা দরবার শরিফের খাদেম সায়েদুল বলেন,  ‘প্রতিদিন রাতে দরবারের জিকির ও মিলাদ হতো। জিকিরে অংশ নিতে সুমি (৫২) নামের এক মুরিদ রাতে দরবারে আসেন। দীর্ঘক্ষণ হুজুরকে (ফরহাদ) ঘুমিয়ে থাকতে দেখে তিনি আমাকে ডাক দেন। আমি এসে দেখি হুজুরের রক্ত মাখা লাশ। পরে পরিবারের অন্যদের খোঁজ নিতে গিয়ে পাশের একটি কক্ষে গৃহকর্মী রুপালিকেও মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। ’

pir-murder-setabganj

ঘটনাস্থলে থাকা জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল হক জানান জানান, পুলিশ এরই মধ্যে তদন্তে নেমে গেছে। সিআইডির সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করছে। পুলিশ সুপার হামিদুল আলম প্রাথমিক তদন্তের বরাতে  সাংবাদিকদের আরও বলেন, নিহত ফরহাদ হোসেন  চৌধুরী (৬৮) দৌলা খানকার পীর হিসেবে পরিচিত। তিনি বিএনপির সাবেক পৌর সভাপতি ছিলেন । স্থানীয়রা জানায়, গেলো ১০ বছর ধরে ফরহাদ হোসেন আখড়াটি চালাচ্ছেন। সপ্তাহে একদিন বিশেষ জিকিরের আসর বসে। আজও এরকম জিকিরের আগে সুযোগ বুঝে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। তারা প্রথমে তাদের গলা কাটে। পরে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।

বোচাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন জানান,ঘটনার ক্লু খোজাঁ হচ্ছে। ঘাতকরা অচিরেই ধরা পড়বে।

আগের সংবাদ

কথিত পীর ও নারী মুরিদের হত্যাকান্ড নিয়ে বাড়ছে গুঞ্জন! খুলছেনা রহস্যের জট!

ফিরে দেখা এমন কিছু ঘটনা

২০১৩ সাল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্লগার, বিদেশি নাগরিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলার বেশি কয়েকটি ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে পুরান ঢাকার গোপীবাগে কথিত পীর লুত্ফর রহমান ফারুকসহ ছয়জনকে জবাই করে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরের বছর আগস্টে রাজধানীর পান্থপথে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী এবং ২০১৫ সালের অক্টোবরে বাড্ডা এলাকায় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকেও জঙ্গিরাই হত্যা করে। ২০১৬ সালে উত্তরাঞ্চলে কথিত পীরসহ ভিন্নমতাবলম্বী লোকজনকে হত্যা করে জঙ্গিরা।

এ সময় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ১৫টি জেলায় ১৪ জনকে হত্যা, ৪ জনকে হত্যাচেষ্টা এবং ছয়টি হামলা হয়েছে ধর্মীয় উৎসাব ও স্থাপনায়। হামলার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হিন্দু পুরোহিত, সাধু, খ্রিস্টান যাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা, পীরের অনুসারী, মাজারের খাদেম, শিয়া অনুসারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি, ব্লগার এবং সমকামীদের অধিকারকর্মী। ২০১৫ সালের নভেম্বরে দিনাজপুর সদরে পেশায় চিকিৎসাক এক ইতালীয় নাগরিককে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। আহত পিয়েরো পারোলারি (৭৮) সেখানে সুইহারি ক্যাথলিক চার্চের ফাদার ছিলেন।

Save

Save