যে গ্রামের দাদী-নানীরা প্রতিদিন স্কুল যায়

indian omen1

ডেস্কঃ  ভারতের মহারাষ্ট্রের ছোট একটি গ্রাম ফাংগান। এই গ্রামের দাদী -নানীদের বয়সী নারীরা প্রতিদিন বিকেলে দল বেঁধে বাড়ি থেকে বের হন। তাঁদের প্রত্যেকের পরনেই থাকে গোলাপী রঙের শাড়ি এবং হাতে থাকে স্কুলের ব্যাগ। তাঁরা পড়াশোনা করছেন। বয়স তাদের কাছে কোনও বিষয় নয়। মহারাষ্ট্রের নারীরা শিক্ষার সুযোগ খুব একটা পান না , পুরুষের থেকে এক-তৃতীয়াংশ কম নারী এখানে লিখতে বা পড়তে পারে। এই বয়স্ক নারীদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যারা ঠিক মতো একটা অক্ষর দেখতে পারেন না আবার কারো বুকে ব্যথা শুরু হয়ে যায় কথা বলতে গেলে। কিন্তু তারপরও বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিনই তারা স্কুলে যান। এ বছরের নারী দিবসে স্কুলটির এক বছর পূর্ণ হলো।

indian omen2
অনসূয়া দেশমুখের বয়স ৯০ বছর। তিনি শ্রমিকের মেয়ে। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁকে বিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, “তখন বই ও স্লেট কেনার মতো টাকা আমাদের ছিলো না। কাপড় কেনার টাকাও ছিলো না। মাঝে মাঝে আমি স্কুলে যেতাম। কিন্তু অসুস্থ হয়ে যেতাম বলে তারা আর পাঠায়নি আমাকে”।

indian omen3
৪১ বছর বয়সী ইয়োগেন্দ্রা বাংগাড় এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। “নারী দিবসে তাদেরকে সম্মান জানানোর কথা বলা হয়। তাই আমি ভাবলাম আমাদের দাদী-নানীদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত। তাদের সময়ের নারীরা স্কুলে যাওয়ার কোনও সুযোগ পাননি। আমার তাদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে ছিলো। বিষয়টা নিয়ে গ্রামের অন্যদের সাথে আলাপ করলাম। তারা এই উদ্যোগে আমাকে সমর্থন জোগালো” –বলেন মি: বাংগাড়।
গ্রামের এক ফসলি জমির পাশে, গাছতলায় বাঁশ দিয়ে বানানো এই স্কুল। একটি মাত্র ব্ল্যাকবোর্ড। মেঝেতেই পাটি পেতে বসার ব্যবস্থা।
ইয়োগেন্দ্রা বাংগাড় জানালেন নারীদের শাড়ি ও শিক্ষার উপকরণ কেনার জন্য তিনি গ্রামের সবার কাছ থেকে অনুদান নিলেন এবং একটি শ্রেণীকক্ষও তৈরি করলেন তিনি। “যদি কোনও নারী শিক্ষিত হয় তবে তার সন্তানেরাও শিক্ষিত হয়। তার ঘরে সে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে রাখে” –বলেন মি: বাংগাড়।
রামাভাই গণপাত, তাঁর নাতি তাঁর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাঁকে স্কুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, “খুবই ভালো লাগছে। স্কুল আমাদের খুব ভালো লাগে। স্কুল ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে সব দাদী-নানিরা একসাথে স্কুলে যাই। আমরা খুব গর্বিত যে আমরা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছি”।
রামাভাই গণপাত হেসে বলেন, “আমাদের কাছে বই আছে কিন্তু তা আমরা পড়তে পারি না। কারণ বয়সের জন্য আমাদের চোখের জ্যোতি কমে গেছে। মৃত্যুর পর যখন ঈশ্বর আমাদের কাছে জানতে চাইবেন যে তুমি তোমার জীবনে কী করেছো? ভেবে ভালো লাগছে যে আমি অন্তত বলতে পারবো আমি আমার নাম স্বাক্ষর করা শিখেছি। আমার স্কুলে আসতে ভালো লাগে”।
শুধু ক্লাসের পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নয় স্কুলের কার্যক্রম। এখানে পড়তে আসা সবাই একটি করে গাছ লাগান স্কুলের মাঠে। সেটির যত্নও তাঁরাই করেন। গাছটির নাম দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর নামে। গাছের পাশেই লেখা থাকে সেই নাম। এছাড়া, ক্লাস শুরুর আগে হিন্দু ধর্মে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী বলে পরিচিত সরস্বতী দেবীকে স্মরণ করা হয়।
স্কুলে ৩০ বছর বয়সী শিক্ষক শীতল মোরে, তিনি বিনা পারিশ্রমিকে এখানে শিক্ষকতা করেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের একজন তাঁর শাশুড়ি।
গত এক বছরে স্কুলের একজন শিক্ষার্থী মারা গেছেন, আর তিনজন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। ‘আজিবাইঞ্চি শালা’ নামের এই স্কুলটির মোট শিক্ষার্থী ২৯ জন নারী। যাদের বয়স ৬০-৯০ বছর।
যখন এসব নারীরা এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন তখন তাদের কারোরই অক্ষরজ্ঞান ছিল না।
“ভারতের বয়স্ক নারীরা হাতের আঙ্গুলের ছাপ ছেড়ে সই করার যোগ্যতা অর্জন করছেন, লিখতে পড়তে শিখছেন-এটা অনেক বড় উদ্যোগ। ভারতের সব গ্রামে এমন স্কুল থাকা প্রয়োজন” -বলেন শিক্ষিকা শীতল মোরে