হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার জনপ্রিয় যান গরু’র গাড়ি

শাহ্ আলম শাহী,স্টাফ রিপোর্টার,দিনাজপুর থেকেঃ

“ওঁকি গাড়িয়াল ভাই- কত রব আমি পন্থের পানে চাঁইয়া রে” গ্রাম-বাংলার প্রাণপ্রিয় এই গানটি যেমন এখন আর শোনা যায় না, তেমনি গ্রাম-বাংলার একটি জনপ্রিয় যান গরু’র গাড়িও এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না।

হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িয়াল পেশাও। এখন আর গ্রাামগঞ্জে আগের মতো চোখে পড়ে না গরু’র গাড়ি। যা এক সময় উত্তর জনপদের বিভিন্ন উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী গরু’র গাড়ি বাহনের সরগরম অস্তিত্ব ছিল। ছিল সর্বত্র এই গরু’র গাড়ির কদর। কি বিয়ে, কি অন্য কোন উৎসব- গরু’র গাড়ি ছাড়া যেন কল্পনাই করা যেত না।

দিনাজপুরেও এক সময় গরু’র গাড়ি চলত প্রতিনিয়ত।

কিন্তু, এখন প্রত্যন্ত এই জনপদেও হারিয়ে যাচ্ছে গরু’র গাড়ি। মাঝে-মধ্যে গ্রামাঞ্চলগুলোতে দু-একটি গরু’র গাড়ি চোখে পড়ে। কিন্তু সেগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। তাহলে কি আধুনিক সভ্যতায় আমরা আমাদের ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যেতে বসেছি? আজ শহরের ছেলে-মেয়েরা তো দূরের কথা, গ্রামের ছেলে মেয়েরাও গরু’র গাড়ি যানবাহনটির সাথে পরিচিত নয় খুব একটা। আগে অনেকেরই গরু’র গাড়ি ছিল উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় এমন তিন থেকে চারটা গাড়িয়াল পট্টি আছে। মাধরবাটী এলাকার গাড়ীয়ান আব্দুল লতিফ এর সাথে কথা হয় গরু’র গাড়ি নিয়ে। তিনি বলেন, আমার বাপ-দাদারা গরু’র গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করে আমাদের বড় করেছেন। এই আধুনিক যুগে গরু’র গাড়ি নেই, আছে অটো বা ইঞ্জিনচালিত যানবাহন।তার পেশা এখন কি? জানতে চাইলে বাবলু বলেন, গরু কেনার টাকা নেই তাই ভ্যানরিক্সা চালাই।

মুরাদপুর এলাকার আহছাস আলী’র সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, আগে মালামাল বহন করার জন্য গরু’র গাড়ির বিকল্প ছিল না। শুধু মালামালই না, কারো বাড়ি নাইর বা বিয়ের জন্য এই গরু’র গাড়ি ছিল একমাত্র ভরসা।

gorur-gari
গাড়ীয়ান ইমাম মোল্লা জানান,আগে আমাদের এলাকায় গরুর গাড়ির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মালামাল থেকে শুরু করে বিয়ে বা আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার একমাত্র বাহন ছিল গরু’র গাড়ি। শুধু কি তাই, এই গরু’র গাড়িগুলোর বিশাল মাঠে কার গাড়ি আগে যায়- তা নিয়ে শুরু হতো বিশেষ প্রতিযোগিতাও।

এখন যেমন আমরা নিজেদের ব্যাবহারের জন্য প্রাইভেটকার বা মাইক্রো ক্রয় করে থাকি, ঠিক তেমনি আগে গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন লোকজন ও গৃহস্থরা গরু’র গাড়ি নিজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করে বাড়িতে রাখতেন।

আপদ-বিপদে তা তারা বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। কখনও কখনও তা আবার ভাড়ায় খাটাতেন। এখন আর গরু’র গাড়ি নেই। গরু’র গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এসে গ্রাম বাংলার সেই জনপ্রিয় গরু’র গাড়ি বাহনটি এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্যগুলোকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। তা নাহলে আমরা যে বাঙালি সেটিই হয়তো একদিন ভুলে যাব।