বেড়েই চলছে বিবাহ বিচ্ছেদ, চট্টগ্রামে প্রতি দুই ঘণ্টায় পড়ছে একটি আবেদন

সময়ের কণ্ঠস্বর – পারস্পরিক আস্থাহীনতা এবং নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলছে। যেমনটা কয়েকদিন আগে এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, ঢাকা মহানগরীতে বিয়ে বিচ্ছেদের হারের পরিমাণটা কতো। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর-দক্ষিণ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে প্রায় ৩১ হাজার। যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় স্বামী তালাকে এগিয়ে রয়েছেন স্ত্রীরা। অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে নারীরা এক্ষেত্রে ঢের এগিয়ে গেছেন, যা কিছুদিন আগেও ছিল সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কল্পনাতীত।

তবে ঢাকা মহানগরীর এই রূপটা দেখা গেছে চট্টগ্রামেও। গত দুমাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে ৭৬৩টি। অর্থাৎ প্রতি দুই ঘণ্টায় একটিরও বেশি আবেদন জমা পড়ছে। অধিকাংশ বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে পারস্পরিক আস্থাহীনতা এবং নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে। ইন্টারনেট ফেসবুক ও মোবাইলে গড়ে ওঠা সম্পর্ককেই এর জন্য দায়ী করছেন চসিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চসিক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য ৩ হাজার ৪৮৬টি আবেদন জমা পড়েছিল। ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৯৬১টি আবেদন জমা পড়ে। আবেদনকারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী। পূর্বে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও যৌতুকের বিষয়গুলো বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বেশি উল্লেখ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব বিষয়ের সঙ্গে অবহেলা, দায়িত্ব পালনে অনিহা, আস্থাহীনতা এবং পরকিয়ার বিষয়গুলো বেশি উল্লেখ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হোসেন বলেন, ফেসবুক, ইন্টারনেট ও মোবাইলের মাধ্যমে সম্পর্কে জড়িয়ে বর্তমানে অধিকাংশ যুবক-যুবতীরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন। বিয়ের পর আবার এসব মাধ্যমে যোগাযোগের সূত্র ধরে অন্য কোনো ব্যক্তির প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন তারা। একপর্যায়ে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন। কোনো রকম সম্পর্কে না জড়ালেও সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে।

divorcechitagong

দূর থেকে মোবাইল, ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুকে গড়ে ওঠা এসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরস্পরের ব্যাপারে ভালোভাবে জানা হয়ে ওঠে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দিয়ে নিজের অবস্থানকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন তরুণ-তরুণীরা। এসব মিথ্যা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। পরে সংসার করতে গিয়ে প্রকৃত সত্য জানতে পারেন তারা। এতে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস জন্ম নেয়। একে অপরের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

অনেক সময় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন স্বামী-স্ত্রী দুজনই। এ বিষয়ে উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে আবেদন করেন। আবেদন জমা দেওয়ার পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিন মাস সময় থাকে। এর মধ্যে যে কেউ চাইলে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন বাতিল করতে পারেন। কিন্তু উকিলদের অসাধুতা বিবাহ বিচ্ছেদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর্থিক লাভের আশায় সম্পর্ক ছিন্ন করতে মক্কেলদের উৎসাহিত করেন উকিলরা।

গতবছর ২৪ সেপ্টেম্বর একজন উকিলের মাধ্যমে দুই বোন একত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য চসিক সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করেন। গত ২ মার্চ দুই বোনের একসঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। আবেদনপত্রে দুই বোনের উল্লিখিত কারণগুলোও একই।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পেশকার আবু জাফর চৌধুরী বলেন, সিটি করপোরেশন অফিসে সরাসরি আবেদন করা দম্পতিদের বুঝিয়ে প্রতিমাসে ৮ থেকে ১০টি আবেদন প্রত্যাহার করানো হয়। কিন্তু উকিলের মাধ্যমে আসা নথিগুলো খুব একটা প্রত্যাহর হয় না। যদিও অধিকাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন উকিলের মাধ্যমেই আসে। যে কেউ চাইলে সিটি করপোরেশন অফিসে সরাসরি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এটা অনেকে জানেন না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি রতন কুমার রয় বলেন, স্বামী-স্ত্রী যদি আলাদা হতে চান সে ক্ষেত্রে উকিলের কিছু করার থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বুঝিয়ে খুব একটা কাজ হয় না। কেননা বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেউ উকিলের কাছে আসেন না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্যই তারা আসেন। উকিল একজন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন মাত্র। তারপরও মক্কেলদের বিবাহ বিচ্ছেদে অনুৎসাহিত করা উকিলদের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সে চেষ্টা তারা করে না বলে আমার মনে হয় না। কেননা একটি বিবাহ বিচ্ছেদের সঙ্গে শুধু একজন নারী বা পুরুষের বিষয় নয়। এর সঙ্গে দুটি পরিবার ও তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎও জড়িত।

একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেনবলেন, গ্রামীণ সমাজ ভেঙে খুব দ্রুত নাগরিক সমাজে পরিণত হচ্ছে। নাগরিক সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে মানুষ। নগর এলাকায় একসঙ্গে অনেক মানুষের আবাসন গড়ে উঠছে। নৈকট্য এবং যোগাযোগের সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাওয়ার কারণে পারস্পরিক সম্পর্ক ও অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এ সবের প্রভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে।