SOMOYERKONTHOSOR

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘গর্ভপাত’

ইসলাম ডেস্ক, সময়ের কণ্ঠস্বর – ভ্রুন হত্যা ও কন্যাসন্তান হত্যা করার প্রবনতা, এই ধরনের ঘৃন্য মানসিকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের এই বস্তুবাদী সমাজে, ব্যভিচার, য়েনা, দারিদ্রতার ভয়ে তাদের সন্তানকে জন্মের আগেই গর্ভে মেরে ফেলা হচ্ছে বা জন্মের পর মেরে ফেলা হচ্ছে। আধুনিক য়ুগে শিক্ষিত থেকে মুর্খ সবার একই অবস্থা। এই সংক্রমক রোগ এমনই প্রকট আকার ধারন করেছে য়া দিন দিন ক্রমবর্ধমান।

গর্ভপাত একজন মায়ের জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে খুব কষ্টের বিষয়। তাই গর্ভধারণের পর সতর্ক থাকা জরুরি। গর্ভপাত যে কেবল নারীদের বিষয়, ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। একটি গর্ভপাত মানে একটি সন্তানের মৃত্যু। বিষয়টি নারীর জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, পুরুষের জন্যও ঠিক ততটাই। কেননা তিনি সন্তানের বাবা। আজকাল অকাল গর্ভপাতের বিষয়টি বেড়ে গিয়েছে খুব।
গর্ভপাত নিয়ে যে দেশেই জরিপ করা হোক না কেন, তার ফলাফল ভিন্ন হতে বাধ্য৷ যেমন চেক প্রজাতন্ত্রে মহিলাদের গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করেন অধিকাংশ মানুষ, কিন্তু পোল্যান্ডে সেই সংখ্যা তত বেশি নয়৷ উত্তর অ্যামেরিকায় ক্যানাডা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা অনুরূপ প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়৷

অপরদিকে মেক্সিকোর মতো দেশে জনগণের একটা বড় অংশ গর্ভপাতের বিরোধী৷ এক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা মেক্সিকোর তুলনায় বেশি উদার৷ অপরদিকে ব্রাজিল কিংবা কলম্বিয়ার জনসাধারণের একটা বড় অংশ গর্ভপাত বৈধ করা উচিত নয়, বলে মনে করেন৷

এবারে চলুন দেখি কোরআন কি বলছে:

কোরানে উল্লেখ নেই, তবে…
কোরান শরিফে স্পষ্টভাবে গর্ভপাতের বিষয়ে কিছু বলা নেই৷ তবে কিছু নির্দেশনা আছে যেগুলো গর্ভপাতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে ইসলামি বিষয়ে পণ্ডিতরা মনে করেন৷

ভ্রুণই জীবন
সূরা আল-মায়দাহের ৩০তম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘যে বা যারা একটি আত্মার জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে, সে বা তারা যেন সব মানুষের জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে৷ যে বা যারা একটি আত্মাকে হত্যা করেছে, সে বা তারা যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করেছে৷’’ আর অধিকাংশ মুসলিম পণ্ডিত মনে করেন, গর্ভে থাকা ভ্রুণকেই ইসলাম জীবন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷

মায়ের জীবন রক্ষা
যদি মায়ের প্রাণ হুমকির মুখে থাকে তাহলে গর্ভপাত সমর্থন করে ইসলাম৷ মুসলিম আইন ‘দু’টি মন্দ জিনিসের মধ্যে যেটি কম মন্দ তাকে’ বেছে নেয়ার প্রতি সমর্থন জানায়৷ এক্ষেত্রে গর্ভপাতকেই ‘কম মন্দ’ মনে করা হয়৷ এর পক্ষে কয়েকটি যুক্তি হচ্ছে মা-ই ভ্রুণের ‘জন্মদাতা’, মায়ের জীবন আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত, মায়ের অন্যান্য দায়িত্ব আছে, মা একটি পরিবারের অংশ এবং মাকে মরতে দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভ্রুণও মরে যায়৷

দারিদ্র্যতার ভয়ে গর্ভপাত
কেউ যদি মনে করেন আগত শিশুকে লালনপালন করা তার পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না এবং সেই ভয়ে ভ্রুণকে মেরে ফেলেন, তাহলে সেটি মহাপাপ বলে বিবেচিত হবে৷ সুরা আর ইসরার ৩২ আয়াত বলছে, ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তানকে দারিদ্রতার ভয়ে হত্যা করো না৷ আমরা তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে দেখেশুনে রাখি৷ তাই তাদের হত্যা করে সত্যিকার অর্থেই একটি মহাপাপ৷’’

ত্রুটি ধরা পড়লে
গর্ভধারণের চার মাসের মধ্যে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভ্রুণ ত্রুটি নিয়ে বাড়ছে এবং এর সমাধান সম্ভব নয়, এবং এই সমস্যা পরবর্তীতে শিশুর জীবন দুর্বিসহ করে তুলতে পারে, তাহলে সেক্ষেত্রে গর্ভপাত সমর্থন করেন অনেক পণ্ডিত৷ এক্ষেত্রে অন্তত দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে৷ অবশ্য এক্ষেত্রেও গর্ভপাতের পক্ষে নন এমন পণ্ডিতও আছেন৷

চার মাস পর…
গর্ভধারণের সময় ১২০ দিন পেরিয়ে গেলে গর্ভপাত সমর্থন না করার পক্ষে মোটামুটি পণ্ডিতদের মধ্যে মিল রয়েছে৷ তবে এক্ষেত্রে যদি ভ্রুণের ত্রুটি মায়ের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেয় তাহলে অন্য কথা৷

মুসলিম দেশের জরিপে বাংলাদেশ শীর্ষে
২০১৩ সালে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মুসলিম নাগরিক নৈতিক বিবেচনায় গর্ভপাত সমর্থন করেন৷ অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি মুসলমানের মধ্যে একজন গর্ভপাতের পক্ষে৷ ৩৭টি দেশের মসুলমানদের উপর পরিচালিত এই জরিপে বাংলাদেশেই গর্ভপাতের পক্ষে সবচেয়ে বেশি মানুষ পাওয়া গেছে৷ আরও জানতে উপরের ‘+’ চিহ্নে ক্লিক করুন৷

ভ্রুণ কি ব্যথা পায়?
২০০৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রুণের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে ব্যথা, এমনকি তার আশেপাশে কী ঘটছে, তা বোঝার মতো নার্ভাস সিস্টেম গড়ে ওঠে না৷ আরেক গবেষণা বলছে, ব্যথা পাওয়ার জন্য যে ‘নিউরো-অ্যানাটোমিকাল অ্যাপারেটাস’ প্রয়োজন তা গড়ে ওঠার কাজ গর্ভধারণের ২৬ সপ্তাহ আগে সম্পূর্ণ হয় না৷

গর্ভপাত যদি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে, কোনো ধরনের কারণ যদি এর মধ্যে না আসে তাহলে এটি হারাম। এটি যে অবস্থা বা যত দিনেই হোক না কেন। কারণ যেহেতু একটি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরে সেটাকে ধ্বংস করা আর সেটা যদি মানবভ্রূণ হয়ে থাকে তাহলে কোনো অবস্থাতেই এটি হালাল নয়, যেহেতু রাসুল (স.) বলেছেন, ‘জা-লিকাল ওয়াদুল খাফি’ অর্থাৎ এটি গোপন হত্যা। এটি গোপনীয়ভাবেই ভ্রূণ হত্যা যেটি সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) এ বিষয়ে তাহদিদ করেছেন, কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন এবং সতর্কবাণী দিয়েছেন। তাই এটি হারাম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোরআনে কারিমের মধ্যে আল্লাহু সুবহানাহুতায়ালা বলেছেন, কেয়ামতের দিন তাদের এই প্রশ্ন করা হবে যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যা করেছে, ইয়া আয়্যিদামবিন কুতিলাত। ওয়া ইজাল মায়ুদু তুছইলাত? (অর্থাৎ কোন অপরাধে এদেরকে হত্যা করা হয়েছে? ) এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে হবে। এটি আমরা বলছিলাম ইনটেনশন সম্পর্কে।

আর আল্লাহু সুবহানাহুতায়ালা তাঁর বান্দাদের, তারা যদি অপরাধ করে থাকে, ক্ষমা করবেনই। অপরাধ বোধে সত্যিকারভাবে যদি কেউ অনুতপ্ত হতে পারে এবং তওবা করে আল্লাহু রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রত্যাবর্তন করেন, ঠিক যেভাবে প্রত্যাবর্তন করা দরকার, অবশ্যই আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করে দেবেন। হতাশ হওয়ার কারণ নেই।

আর রাসুলুল্লাহ (স.) এ বিষয়টি হাদিসের মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, তওবাকারী ব্যক্তি হচ্ছে ওই ব্যক্তির মতো যার কোনো গুনাহই নেই। সুতরাং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি কাউকে ক্ষমা করেন, তাহলে বান্দাকে আল্লাহু সুবহানাহুতায়ালা শুধু তাকে ক্ষমা করবেন এটাই নয়, বরং তাকে একেবারে গুনাহমুক্ত করে দেবেন।