রিমান্ডে থাকা দুই ধর্ষক সাফাত ও সাদমানের ‘চাহিদা’ পূরণে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নাকাল অবস্থা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, সময়ের কণ্ঠস্বর:

রাজধানী ঢাকার বনানীর সেই আলোচিত রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে থাকা ধনীর দুলাল সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু সাদমান সাকিফের নানা রকমের ‘চাহিদা’ পূরণ করতে গিয়ে রীতিমত  নাকাল অবস্থায় পড়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে তারা বলছেন, তদন্তের প্রয়োজনে  দুই অভিযুক্তের একের পর এক বিভিন্ন চাহিদা পুরন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সবাইকে।

চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলাটির তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, বেশির ভাগ সময় সাফাত পুলিশের সরবরাহ করা খাবার গ্রহণ করছে না। এর বিপরীতে সে দেশের প্রথম শ্রেণীর অভিজাত রেস্টুরেন্ট থেকে ফাস্টফুড আইটেমের খাবার এনে দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। সাফাতের চাহিদা মেটাতে বিদেশি ‘ব্ল্যাক’ ব্র্যান্ডের সিগারেটও সরবরাহ করতে হচ্ছে গোয়েন্দাদের।

নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐ কর্মকর্তা বলেন, দুই একবার তার এ ‘চাহিদা’ রক্ষা করা হয়েছে। যদিও পুলিশ হেফাজতে থাকা কোনো আসামিকে বাইরের খাবার দেয়ার নিয়ম নেই। তারপরও জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত তথ্য পেতে তারা (পুলিশ) মাঝে মধ্যে আসামির সঙ্গে সখ্য গড়তে এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করে থাকেন তারা। তিনি দাবী করেন এসব কৌশল কাজেও লাগছে, ভালো খাওয়া দাওয়া পেয়ে অভিযুক্ত দুই ধর্ষকের পেট থেকে  বেরিয়ে আসছে চমকপ্রদ সব তথ্য।

ঐ কর্মকর্তা আরও জানান, ভালো খাওয়া দাওয়া সহ ছোট-খাটো চাহিদা পুরনের জন্যই খুব সহজ জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত জানান, বন্ধু নাঈম আশরাফের মাধ্যমেই সুন্দরী মডেলদের ডাকতেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই বন্ধুর মাধ্যমে তিনি সুন্দরী তরুণীদেরও সংগ্রহ করতেন। এরপর কোনো না কোনো হোটেলে পার্টির আয়োজন করতেন। আর সেখানেই রাতভর ফূর্তিতে মেতে উঠতেন তিনি। এসব পার্টি চলত গভীর রাত পর্যন্ত। কখনও কখনও ভোরের আলোয় ভাঙত তাদের সেই মিলনমেলা।  সুন্দরী মডেল-আইটেম গার্লরা ছাড়াও মাঝে মধ্যে বিদেশি অতিথিদের আনা হয় এসব জলসায়।

ঐ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিন (শনিবার) কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছেন সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ। রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন শেষে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রোববার রাতে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেও রাজি হন সাফাত। তবে সেদিনের ঘটনাকে কোনোভাবেই ধর্ষণ বলতে রাজি নন সাফাত আহমেদ। বরং সমঝোতার মধ্য দিয়েই সবকিছু হয়েছে বলে দাবি করছেন সাফাত।

তবে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় এনে আরও কিছু সময় নিতে চান তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে চাঞ্চল্যকর এ ধর্ষণ মামলা তদন্তে গঠিত সহায়ক কমিটির প্রধান ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। এ কারণে তারা ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন।

মামলায় যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা প্রমাণযোগ্য করার মতো তথ্য পেলেই গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আগামী শুক্রবার এ ব্যাপারে ডিএমপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করা হতে পারে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা কৃষ্ণপদ রায়।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে পারে জেনেও সাফাত দেশ ছাড়তে চায়নি। তার ধারণা ছিল, যেভাবেই হোক বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম তাকে ছাড়িয়ে নেবেন। এ ঘটনা নিয়ে মিডিয়ায় লেখালেখি কিছুটা বন্ধ হলে নিজেই আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেবেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত বলেছেন, ওই ঘটনার পর মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলে বাবার পরামর্শেই সে কিছু দিনের জন্য আত্মগোপনে চলে যান। তবে পলাতক অবস্থায় সময় কাটানোর জন্য তিনি সাদমান সাকিফকে তার সঙ্গে রাখেন। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্তের এ পর্যায়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণে সেদিন রাতে দুই তরুণীকে সাফাত ও নাঈম ধর্ষণ করেছিল বলে প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পর ধর্ষিত দুই তরুণীর শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে। এ কারণে মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মিলবে না ধরেই তারা তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে তদন্তে মেডিকেল রিপোর্টের বাইরে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য আলামতের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘটনার দিন দি রেইনট্রি হোটেলের রুমপার্টিতে সাফাতের দুই বান্ধবী যোগ দিয়েছিলেন। অপরদিকে ধর্ষিত দুই তরুণীর দুই বন্ধুকে একটি কক্ষে সারারাত আটকে রাখা হয়েছিল। এই চারজনকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী করা হতে পারে।

এই বিষয়ে মামলার তদন্তকারী সংস্থা উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের এডিসি আসমা সিদ্দিকা মিল বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে যাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন, তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ স্পর্শকাতর এ মামলাটি তদন্ত করছে বলে তিনি দাবি করেন। প্রসঙ্গত, ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে বনানীর ‘দি রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই তরুণী।

এদিকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় পুরান ঢাকার নবাবপুর থেকে সাফাতের গাড়িচালক ও দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১০। গ্রেফতারের পরপরই জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে রেইনট্রি হোটেলে সেই রাতের চঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দেন সাফাতের ব্যক্তিগত গাড়িচালক বিল্লাল।

গাড়িচালক বিল্লাল জানায়, জন্মদিনের পার্টিতে দুই তরুণীকে সেদিন রাতভর ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি দুই ধর্ষক সাফাত ও নাঈম। ধর্ষণের পর গর্ভধারণ রোধে দুই তরুণীকে জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ খাওয়ানো হয়।

এর আগে গত রবিবার ধর্ষণের আগে ভিডিও করার কথা স্বীকার করে সাফাত আহমেদ গোয়েন্দাদের জানিয়েছিল, অভিযোগকারী দুই ছাত্রীর সঙ্গে আসা শাহরিয়ার নামে এক চিকিৎসককে মারধরের দৃশ্য তারা ভিডিও করেছে। আর ধর্ষণ করার আগে গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ওই দুই ছাত্রীর সঙ্গে তাদের ওঠাবসার দৃশ্য ভিডিও করেছেন। তবে এর বাইরে ধর্ষণ করার সময় সেই দৃশ্য গাড়িচালক ভিডিও করেছে কি না তার জানা নেই।

যদিও রেইনট্রি হোলেটের ৭০১ নম্বর কক্ষে মোবাইল ফোনে ভিডিও করার দৃশ্য এখনও পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি।

জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত আরো জানান, বন্ধু নাঈম আশরাফের মাধ্যমেই সুন্দরী মডেলদের ডাকতেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই বন্ধুর মাধ্যমে তিনি সুন্দরী তরুণীদেরও সংগ্রহ করতেন। এরপর কোনো না কোনো হোটেলে পার্টির আয়োজন করতেন। আর সেখানেই রাতভর ফূর্তিতে মেতে উঠতেন তিনি। এসব পার্টি চলত গভীর রাত পর্যন্ত। কখনও কখনও ভোরের আলোয় ভাঙত তাদের সেই মিলনমেলা।

তিনি আরও জানান, সুন্দরী মডেল-আইটেম গার্লরা ছাড়াও মাঝে মধ্যে বিদেশি অতিথিদের আনা হয় এসব জলসায়।

এর আগে প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত বাংলাদেশের সিনেমা জগতের ৪ জন নায়িকার সঙ্গে নিয়মিত অবৈধ সম্পর্ক থাকার কথা জানান। যাদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে তিনি অনৈতিকভাবে মেলামেশা করতেন। এছাড়া প্রায় এক ডজন বান্ধবীর নাম ফাঁস করেছেন, যাদের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের কথাও খোলামেলা স্বীকার করেছেন। এ সব বান্ধবীদের মধ্যে উঠতি কয়েকজন মডেলও রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, প্রতি রাতেই তিনি ও তার বন্ধুরা পার্টি করতেন। পাঁচ তারকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এসব পার্টিতে বন্ধু-বান্ধবীরা হাজির থাকতেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে বনানীর ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণী। ওই ঘটনায় ৬ মে রাজধানীর বনানী থানায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ (সিরাজগঞ্জের আবদুল হালিম) ও সাদমান সাকিফসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তারা।

সম্পর্কিত খবর

দুই ছাত্রী ধর্ষণ: ফেঁসে যাচ্ছেন বনানী থানার ওসি ফরমান!

বনানী থানার ওসির কাজে অবহেলার ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হন ফরমান আলী। এর আগে তিনি ৫ দিনের ছুটি শেষ করে রবিবার থানায় যোগদান করেন।

দুপুরে তদন্ত কমিটির প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসময় তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা এবং তাকে বেশ নার্ভাস লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে এক কর্মকর্তা। এই কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন ও যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান মিজানুর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগে এ ঘটনায় দুই ভিকটিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তে কারো কোনো গাফিলতির প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে দুই ছাত্রীকে ডেকে ধর্ষণ করা হয়। ৪ মে দুই অভিযোগকারী বনানী থানায় মামলা করতে যান। এসময় থানার ওসি তাদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেন। থানা থেকে তাদের বের করে দেন।

পরে ৬ মে দুই অভিযোগকারী থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, থানার ওসি মামলার আসামিদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। এ কারণে তিনি এই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো বাদীর চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ওই ধর্ষিতা দুই ছাত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বলতে পারেন আমরা থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে দ্বিতীয়বার পুলিশের কাছে ধর্ষণের শিকার হয়েছি।’ এরপরই নড়েচড়ে উঠে পুলিশ প্রশাসন। গঠন করে তদন্ত কমিটি। তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ মিললে ওই পুলিশ কর্মকর্তা সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত হতে পারেন।

এদিকে রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের আগে ভিডিও করার কথা স্বীকার করলেন ধর্ষণের এই মামলায় গ্রেফতার সাফাত আহমেদ। রবিবার রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনের গোয়েন্দাদের তিনি এ তথ্য জানান।

ডিবি কর্মকর্তাদের জেরার মুখে এদিন সাফাত বলেন, অভিযোগকারী দুই ছাত্রীর সঙ্গে আসা শাহরিয়ার নামে এক চিকিত্সককে মারধরের দৃশ্য তারা ভিডিও করেছে। আর ধর্ষণ করার আগে গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ওই দুই ছাত্রীর সঙ্গে তাদের ওঠাবসার দৃশ্য ভিডিও করেছেন। তবে এর বাইরে ধর্ষণ করার সময় সেই দৃশ্য গাড়িচালক ভিডিও করেছে কি না তার জানা নেই।

যদিও রেইনট্রি হোলেটের ৭০১ নম্বর কক্ষে মোবাইল ফোনে ভিডিও করার দৃশ্য এখনও পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি।

জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত আরও জানান, বন্ধু নাঈম আশরাফের মাধ্যমেই সুন্দরী মডেলদের ডাকতেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই বন্ধুর মাধ্যমে তিনি সুন্দরী তরুণীদেরও সংগ্রহ করতেন। এরপর কোনো না কোনো হোটেলে পার্টির আয়োজন করতেন। আর সেখানেই রাতভর ফূর্তিতে মেতে উঠতেন তিনি। এসব পার্টি চলত গভীর রাত পর্যন্ত। কখনও কখনও ভোরের আলোয় ভাঙত তাদের সেই মিলনমেলা।

তিনি আরও জানান, প্রথম সারির সুন্দরী মডেল-আইটেম গার্লরা ছাড়াও মাঝে মধ্যে এ সারির বিদেশি অতিথিদের আনা হয় এসব জলসায়।

এর আগে, প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত বাংলাদেশের সিনেমা জগতের ৪ জন নায়িকার সঙ্গে নিয়মিত অবৈধ সম্পর্ক থাকার কথা জানান। যাদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে তিনি অনৈতিকভাবে মেলামেশা করতেন। এছাড়া প্রায় এক ডজন বান্ধবীর নাম ফাঁস করেছেন, যাদের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের কথাও খোলামেলা স্বীকার করেছেন। এ সব বান্ধবীদের মধ্যে উঠতি কয়েকজন মডেলও রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, প্রতি রাতেই তিনি ও তার বন্ধুরা পার্টি করতেন। পাঁচ তারকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এসব পার্টিতে বন্ধু-বান্ধবীরা হাজির থাকতেন।

জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত জানান, তাদের ২০ থেকে ২২ জন বন্ধুর একটি গ্রুপ আছে। এ গ্রুপে তাদের বন্ধুদের মধ্যে দেশের বেশ কয়েকজন শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের প্রভাবশালীদের সন্তান রয়েছে। তারা রাত হলেই একটি স্থানে জড়ো হন। প্রতিরাতেই তারা পাঁচ তারকা হোটেলে বিভিন্ন পার্টি ছাড়াও রেসিং কার নিয়ে লং ড্রাইভে যেতেন। মাঝে মধ্যে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ আশপাশের দেশে দল বেঁধে বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন।

প্রতিদিন তার হাত খরচের দুই লাখ টাকা তার বাবা দিতেন বলে দাবি করেন সাফাত। কখনো এর বেশি টাকার প্রয়োজন হলে ঢাকা শহরে আপন জুয়েলার্সের ৮টি শোরুমের যে কোনো একটিতে ফোন করে অতিরিক্ত টাকা আনিয়ে নিতেন। কখনো তার বাবা এ টাকা খরচের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেননি।

সূত্র বলছে, ২৮ মার্চ রেইন ট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনার সময় উপস্থিত দুই অভিযুক্তের বন্ধু শাহরিয়ার আহমেদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। একপর্যায়ে শাহরিয়ার আহমেদকে সাফাতের মুখোমুখি করা হয়। শাহরিয়ার পুলিশকে বলেন, সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তার দুই ধর্ষিতা বান্ধবীর আমন্ত্রণে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। ওই দিন সঙ্গে তার গার্লফ্রেন্ডও ছিল। সেদিন তার গার্লফ্রেন্ডকেও নির্যাতন করতে চেয়েছিল সাফাত ও নাঈম। এ ক্ষেত্রে বেশি আগ্রাসী ছিল নাঈম।

তিনি বলেন, ‘এ সময় আমি ও আমার ধর্ষিতা বান্ধবী সাফাত ও নাঈমের পা জড়িয়ে ধরে তাকে নষ্ট না করতে অনুরোধ করি। সাফাত আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছিল বলে আমার গার্লফ্রেন্ড ধর্ষিত হয়নি। তবে আমাকে বেধড়ক পিটিয়েছিল সাফাত, সাকিফ ও নাঈম। মাথায় পিস্তল ধরে উল্টাপাল্টা স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল। ’

এক পর্যায়ে শাহরিয়ারকে সামনে রেখে সাফাত ও সাকিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। শাহরিয়ারকে মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে সাফাত। চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলার চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত সহায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ডিবির যুগ্ম-কমিশনার আবদুল বাতেন। গত রাতে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ধর্ষণের ভিডিওচিত্রের ব্যাপারে মুখ খুলছে না গ্রেফতার দু’জন। তবে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত রয়েছে এমন অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতে পারে।

চাঞ্চল্যকর এ ধর্ষণ মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, সাফাত আহমেদের দেয়া তথ্য তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। তবে ওই দুই তরুণীর সঙ্গে তাদের যৌন সম্পর্কের বিষয়টি আপসে হয়েছে- সাফাতের এমন দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ ওই ধর্ষণ মামলাটি তদন্ত করছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব তথ্য-প্রমাণ আমলে নেয়া হচ্ছে না। কারণ আপসে হলে মামলা হওয়ার সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে বনানীর ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণী। ওই ঘটনায় ৬ মে রাজধানীর বনানী থানায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ (সিরাজগঞ্জের আবদুল হালিম) ও সাদমান সাকিফসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তারা। বর্তমানে সাফাত আহমেদ ছয় ও সাদমান সাকিফ পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

দুই তরুণীকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ মামলার পলাতক আসামি মোহাম্মদ হালিম ওরফে নাঈম আশরাফ, ড্রাইভার বেলাল ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদের অবস্থান জানতে তাদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।