সেন্ট্রাল হাসপাতাল ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় প্রাণ গেল ঢাবি ছাত্রীর

নিউজ ডেস্ক, সময়ের কণ্ঠস্বর: রাজধানীর গ্রিন রোডে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ‘ভুল চিকিৎসা’য় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নাম আফিয়া জাহিন চৈতি (২১)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের লসমানপুর গ্রামে।

vul treatment in dead a dhabi chatri

ডাক্তারের  ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যুর অভিযোগে হাসপাতালে ভাংচুর চালিয়েছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তারা হাসপাতালটি বন্ধ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সনদ বাতিলসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবির মুখে হাসপাতালের দুই চিকিৎসককে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে।

ঢাবি ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালক ডা. এমএ কাশেমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী বাদী হয়ে গতকাল রাতে এ মামলা দায়ের করেন। এজাহারভুক্তদের মধ্যে এমএ কাশেম

পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। আটক অন্য এক চিকিৎসকের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটি নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান চলছে। সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না।

চৈতির সহপাঠী ও স্বজনদের অভিযোগ, বুধবার ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত চৈতির চিকিৎসা দেন সেন্ট্রাল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন চৈতি। এরপরই তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। সহপাঠী ও স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসায় চৈতির মৃত্যু হয়েছে।

আফিয়া জাহিন চৈতির সহপাঠীরা জানান, তিনি আজিমপুরে একটি মেসে থাকতেন। বুধবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে চৈতির সহপাঠী ও বাসার মালিক তাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রথমে জানান, তার ক্যান্সার হয়েছে এবং পরে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত। চৈতির বড় বোন নীহারিকা আফরোজ বলেন, তিনি খবর পেয়ে রাজশাহী থেকে বুধবার সন্ধ্যায় সেন্ট্রাল হাসপাতালে আসেন।

তিনি চিকিৎসকের কাছে বোনের রোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, তার বোনের ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। অবস্থা ভালো নয়। রাতে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়। নীহারিকা জানান, বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চৈতি অজ্ঞান হয়ে পড়লে চিকিৎসক ও নার্সরা তাকে আইসিইউতে নিয়ে যান। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর চিকিৎসকরা তাকে (নীহারিকা) জানান, চৈতি ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। নীহারিকার অভিযোগ, চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় তার বোনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসক-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, চৈতি লাইফ সাপোর্টে আছে_ এমন খবর পেয়ে দুপুর ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী সেন্ট্রাল হাসপাতালে যান। তারা হাসপাতালের নিচতলায় ব্যাপক ভাংচুর চালান। নিচতলার চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটার থেকে শুরু করে হাসপাতালের গ্গ্নাস ও সব আসবাব ভাংচুর করা হয়। এক চিকিৎসককে মারধর করেন তারা। ভাংচুর চালাতে গিয়ে কাচ দিয়ে এক শিক্ষার্থীর পা কেটে যায়।

পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। খবর পেয়ে বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ যায় ঘটনাস্থলে। হাসপাতালটি বন্ধ, মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সনদ বাতিল ও শাস্তি, চৈতির পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভুল রিপোর্ট যিনি দিয়েছেন, তার শাস্তিসহ নয় দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা ।

শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পুলিশ হাসপাতালের অন্যতম পরিচালক ডা. এম এ কাশেমসহ দু’জনকে আটক করে ধানমণ্ডি থানায় নিয়ে যায়। এরপর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শান্ত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী বলেন, একজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। চিকিৎসায় এ ধরনের অসাবধানতা কখনোই কাম্য নয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আমরা তাদের অনেক বুঝিয়ে নিবৃত করেছি। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় অভিযোগ এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। মামলা হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

পুলিশের ধানমণ্ডি জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহিল কাফী  বলেন, ভুল চিকিৎসায় ঢাবি ছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগে সেন্ট্রাল হাসপাতাল ভাংচুর করেছেন শিক্ষার্থীরা। দুই চিকিৎসককে আটক করা হয়েছে।

সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মতিউর রহমান  বলেন, বুধবার সকালে চৈতিকে ভর্তি করা হয়। তার পাঁচ দিন আগে থেকে জ্বর ছিল। তার বি্লডিং হচ্ছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্যান্সার হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পরে তার ডেঙ্গু ভাইরাস ধরা পড়ে। তিনি বলেন, আমরা সাধ্যমতো তার চিকিৎসা দিয়েছি।

এর আগেও সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ আছে। ভুল চিকিৎসায় গত ১৩ মে ডিজিএম (সার্কুলেশন) অমিত রাইহানের মৃত্যু হয়। তার আত্মীয়স্বজন জানান, ১২ মে রাতে অমিত রাইহান বুকে ব্যথা অনুভব করেন। রাত ১টার দিকে তাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকের পরামর্শে রাতেই তিনি বাসায় যান।

হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও গ্যাস্ট্রিকের কারণে তার বুকে ব্যথা বলে জানানো হয়। বাসায় ফিরে আবার যন্ত্রণা শুরু হয় তার। ব্যথা বাড়ায় ১৩ মে সকাল ৭টায় আবারও যান সেন্ট্রাল হাসপাতালে। চিকিৎসক তাকে ভুল চিকিৎসা দেন, বিষয়টি বুঝতে পেরে স্বজনরা তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পরই তার মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ_ সেন্ট্রাল হাসপাতাল অমিতের রোগ নির্ণয় করতে পারেনি। বরং ভুল চিকিৎসা দিয়ে কালক্ষেপণ করার কারণেই তার মৃত্যু হয়।