অবশেষে উদ্ধার হলো দুই ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনার ৪৮ মিনিটের ভিডিও ক্লিপ!

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা-

বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনার ৪৮ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ জব্দ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। রিমান্ডে থাকা মামলার আসামি নাঈম আশরাফের মোবাইল থেকে এ ভিডিওটি পাওয়া গেছে বলে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র।

‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফের (মো. আব্দুল হালিম) বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম এস এম মাসুদ জামান এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার অন্যতম আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিকের পুত্র সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু সাদমানকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। সাফাতের গাড়ি চালক ও দেহরক্ষীও রিমান্ডে রয়েছে।

সুত্র জানিয়েছে হালিম ওরফে নাঈমের মোবাইলের একটি ফোল্ডারে পাসওয়ার্ড দেয়া ছিলো ভিডিও ফাইলটি । উদ্ধার হওয়া ভিডিও থেকে মামলার গুরুত্বপুর্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ সুত্র ।

সেদিন রাতে হোটেলের দুই রুমের মাঝখানে টয়লেট থেকে ধর্ষণের চিত্র বিল্লালের মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়। সেই ভিডিওচিত্র মামলা হওয়ার পর মুছেও ফেলা হয়। ধর্ষণের আগে দুই তরুণীকে জোর করে নেশা খাইয়ে অচেতন করা হয়।

এরপর তাদের পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। গত সোমবার ও গতকাল র্যাবের হাতে গ্রেফতার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর এমন তথ্য পেয়েছিলেন তদন্তকারীরা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিল্লালের মোবাইলে যে ভিডিওচিত্র ছিল তা সবগুলোই মুছে ফেলা হয়েছে। সেগুলো তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

ব্রেকিং – আপডেট শনিবার দুপুর ১টা 
‘সাফাতের সঙ্গে অভিযোগকারী একজনের জড়িয়ে ধরার ছবি রয়েছে’ উল্লেখ করে একজন ডিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছবিগুলো ফটোশপ অথবা প্রযুক্তিগত কৌশল তৈরি করা কি না ষে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নাঈমের পর এবার ধর্ষণের ভিডিও উদ্ধার হলো সাফাতের মোবাইল থেকেও ! এই লিংকে বিস্তারিত

এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে বিল্লাল হোসেনকে গ্রেফতার করে র্যাব। একই সময় সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলী ওরফে আবুল কালাম আজাদকে গুলশান এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ত্র ঠেকিয়ে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে। তবে বিল্লালের মোবাইল ফোন থেকে ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে। এই ভিডিও ফুটেজ উদ্ধারের জন্য ডিবি পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তা নেবে। এ ছাড়া দুই ছাত্রীকে অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করার কথাও স্বীকার করে দেহরক্ষী রহমত আলী। তবে তারা সবই করেছে তাদের মালিক সাফাত আহমেদের নির্দেশে। সাফাত আহমেদের অধীনে চাকরি করে বলে তাদের করার কিছুুই ছিল না। যখন যা নির্দেশ দিত তাই তাদের মানতে হতো। এটাই তাদের ছিল চাকরি।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে, বিল্লালের মোবাইল থেকেও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভিডিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তবে আজ হালিম ওরফে নাঈমের কাছে উদ্ধার হওয়া ৪৮ মিনিটের ভিডিওতে কি আছে ষে সম্পর্কে কিছু জানায়নি সুত্রটি ।

এর আগে রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের পুত্র সাফাত আহমেদ ও রেগনাম গ্রুপের পরিচালক সাদমান সাকিফ গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে সাফাত ধর্ষণের ঘটনা স্বীকার করে ঐ দৃশ্য ভিডিও করার কথা বলেছেন।

পরবর্তীতে ঐ দুই ছাত্রীকে কয়েকবার রেইনট্রি হোটেলে আমন্ত্রণ জানানো হয়। হোটেলে আসতে না চাইলে তাদের ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ধর্ষণের সময় হোটেলের ৭০১ ও ৭০২ নম্বর কক্ষের বাথরুমের দরজায় ফলস গ্লাস লাগানো রয়েছে। বাহিরে থেকে বাথরুমের ভিতরে কিছু দেখা না গেলেও ভিতর থেকে সবই দেখা যায়। বাথরুম থেকে গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন তার মোবাইল ফোন দিয়ে ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করে। এই ভিডিও ফুটেজ ঐ দুই ছাত্রীকে ফেরত দেওয়ার নাম করে ঘটনার এক সপ্তাহ পর বনানীর পিকাসো রেস্টুরেন্টে তারা মিলিত হন।

সেখানে সাফাত ভিডিও ফুটেজ ফেরত দেওয়ার শর্ত হিসাবে আরো একবার তারা মিলিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু ঐ দুই ছাত্রী তার শর্ত মেনে না নিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

গতকাল বৃহস্পতিবার সিএমএম আদালতের পৃথক বিচারক সাফাত ও সাকিফের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আহসান হাবীব আসামি সাফাতের ও ম্যাজিস্ট্রেট সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী আসামি সাকিফের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মাসুদ জামানের আদালতে গ্রেফতার আসামি নাঈম আশরাফকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি। রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে নাঈমের সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন আদালত।

ধর্ষণের কথা স্বীকার নাঈমের

দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান মোহাম্মদ হালিম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেফতারের পর নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান মোহাম্মদ হালিমকে ঢাকায় ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন্সের তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন নাঈম।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, নারী নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে, সে অনুযায়ী অভিযোগের সমর্থনে প্রাথমিক কিছু তথ্য তারা জিজ্ঞাসাবাদে পেয়েছেন। তবে চার আসামির রিমান্ড এখনও শেষ না হওয়ায় এবং পঞ্চম আসামি মাত্র ধরা পড়ায় ঘটনার খুঁটিনাটি নিয়ে এখনই সংবাদ মাধ্যমের সামনে বিস্তারিত বলা সমীচীন হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, প্রধান অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ কেবল শুরু হয়েছে। সেখানে যৌন সংস্পর্শের কথা আমরা জানতে পেরেছি। কী পরিস্থিতিতে কী হয়েছিল জিজ্ঞাসবাদ শেষেই আমরা তা নিশ্চিত করতে পারব।

ধর্ষণের ঘটনা গত ২৮ মার্চ ঘটলেও অভিযুক্তদের হুমকির কারণে মামলা গ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ বাদী নিজেই এজাহারে বলেছেন। পুলিশ সেই মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠায় পুলিশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইনের কাছে প্রভাবশালী বলে কিছু নেই। অপরাধী অপরাধীই। ওই ঘটনায় আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতারণার অনেক অভিযোগ নাঈমের বিরুদ্ধে

লৌহজংয়ে চান্দেরবাজার এলাকায় দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়র বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন নাঈম আশরাফ। বুধবার রাতে সেখান থেকেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের গান্ধাইল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আলী আশরাফের ছেলে হচ্ছেন নাঈম আশরাফ। তবে তার আসল নাম হাসান মোহাম্মদ আব্দুল হালিম। তিনি ঢাকায় ই-মেকার্স বাংলাদেশ লি. নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে উচ্চবিত্ত ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। গত ৬ মে মামলার পর গণমাধ্যমে নাঈমের ছবি দেখে হালিম বলে শনাক্ত করেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের গান্ধাইল গ্রামের বাসিন্দারা। বিষয়টি শনাক্ত করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ হওয়ার পর তাকে প্রতারক বলে মন্ত্রী মন্তব্য করে বলেন, ‘তাকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই গ্রেফতার করা হবে। ও এলাকার একজন প্রতারক।’ হালিম গান্ধাইল গ্রামের ফেরিওয়ালা আমজাদ হোসেনের ছেলে। এলাকায় প্রতারক হিসেবে তার পরিচয় ছিল।

গ্রামবাসী জানায়, হালিম প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিকে তার বাবা পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা আদায় করেছেন। এমনকি এলাকায় বিয়েও করেছিলেন দুই বার। ঢাকায় এসে নাঈম আশরাফ নাম নিয়ে ই-মেকার্স বাংলাদেশ নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ২০১৪ সালে ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী অরিজিত্ সিংয়ের কনসার্টের আয়োজন করেন তিনি।

নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে হালিম সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে পোস্টার-ব্যানারও লাগাতেন। অবশ্য সংগঠনে তার কোনো পদ ছিল না বলে জানান স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাজীপুরের নেতারা।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাতের সঙ্গে নাঈমের ঘনিষ্ঠতার কথা সাফাতের সাবেক স্ত্রী ফারাহ মাহবুব পিয়াসাও জানিয়েছেন। সাফাত সব সময় নাঈমের কথায় চলতেন বলে পিয়াসার ভাষ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাঈমের নিজের পাতায় সাফাতের বাড়িতে পারিবারিক আবহে ছবিতে তাকেও দেখা যায়।

রাজধানীর বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদ, তার গাড়ি চালক বিল্লাল, গানম্যান রহমত ও নির্যাতিতা দুই তরুণীর বন্ধু সাদমান সাকিফকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এই সংক্রান্ত আগের প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ

এরই মধ্যে ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে বিভিন্ন রকম তথ্য দিয়েছে সাফাত। উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশকে সে জানিয়েছে, তার অগণিত বান্ধবীর কথা। জিজ্ঞাসাবাদে তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ অন্তত দুই ডজন বান্ধবীর তথ্য দিয়েছে সাফাত আহমেদ।

আলোচিত দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের সেই রাতে আরো তিন তরুণীর সঙ্গে ফুর্তি করেছিল সাফাত আহমেদ। এর আগে শরীরে শক্তি বাড়াতে ইয়াবা সেবন করে নেয়। শুধু তাই নয়, এমন আরো দুই ডজন তরুণীর সঙ্গে সময়ে-অসময়ে মিলিত হতো।

মাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছে আলোচিত দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর ক্ষেত্রে। তাদের জন্মদিনের পার্টির কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল সাফাত। আর ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে লুটে নেয় ইজ্জত। এতেই ঘটে বিপত্তি।

ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে নানা তথ্য দিচ্ছে সাফাত। পুলিশকে জানিয়েছে, তার অগণিত বান্ধবীর কথা। জিজ্ঞাসাবাদে তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ অন্তত দুই ডজন বান্ধবীর তথ্য দিয়েছে সাফাত আহমেদ।

যাদের সঙ্গে বনানীর কয়েক হোটেলে প্রায়ই দিনে-রাতে সময় কাটিয়েছে সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ। বান্ধবীদের প্রায় সবাই মডেল, উপস্থাপক, অভিনেত্রী, শিল্পী হিসেবে পরিচিত। প্রথম শ্রেণির কয়েক মডেল ও অভিনেত্রীর নামও রয়েছে এই তালিকায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত আহমেদের বেপরোয়া জীবনযাপন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে গাড়িচালক বিল্লাল। সেই সঙ্গে গানম্যান রহমতের কাছ থেকে ওই রাতের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।

সাফাত আহমেদ জানিয়েছেন, বন্ধুদের উৎসাহে মাঝে মধ্যে পার্টি দেয়া হতো। এসব পার্টিতে অনেকেই অংশ নিতো। কোনো কোনো অভিনেত্রী, মডেল তার সঙ্গে দেশের বাইরে যেতে স্বেচ্ছায় প্রস্তাব করতেন। দুইজন আইটেম গার্ল ও একজন প্রতিষ্ঠিত মডেল ও দুইজন অভিনেত্রীর সঙ্গে ভারত ও মালয়েশিয়ায় অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছিলেন সাফাত আহমেদ। সর্বশেষ মার্চে কলকাতায় একজনের সঙ্গে ছিলেন কয়েকদিন।

বনানী ও গুলশানের কয়েকটি হোটেলে ছিল তাদের রাতের আড্ডা। গুলশান-২ এর একটি হোটেলে ওই ঘটনার কয়েকদিন আগে ২৬শে মার্চ দুই মডেলের সঙ্গে মদের আড্ডা দিয়েছিলেন সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ। সেখানে প্রভাবশালী এক নেতার ছেলেও অংশ নিয়েছিলেন।

সাফাত দাবি করেছেন, তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো। এমনকি নগদ টাকা দেয়া হতো অনেক মেয়েকে। বান্ধবীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছিলো তার। একবার তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মেয়েরাই তাকে কল করে কথা বলতো। তারমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এসব তরুণীদের সঙ্গে পরিচয়-সম্পর্কের সূত্রপাত করিয়ে দিতো নাঈম আশরাফ।

সাফাত আহমেদের কললিস্ট থেকে গোয়েন্দারা অনেক তরুণীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছে। সূত্রমতে, তাদের মধ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক মডেলের বাসায় গিয়ে আড্ডা দিতেন সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ।

সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলতো তাদের আড্ডা। জিজ্ঞাসাবাদে সাফাতের দেয়া তথ্যমতে, যখন কোনো পার্টির আয়োজন করা হতো তখন পার্টিতে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে চাইতো অনেকে। তাদের সবাইকে একসঙ্গে ডাকা সম্ভব হতো না। তাই বাধ্য হয়েই পার্টির বিষয় সকল বান্ধবীদের জানাতেন না সাফাত। এ জন্য মিথ্যাও বলতে হতো তাকে। যে কারণে ২৮শে মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের নামে পার্টি করলেও তা ঘনিষ্ঠ অনেক বান্ধবীদের জানাননি।

একজন মডেল জানিয়েছেন, ২৭শে মার্চ তার সঙ্গে কথা হয়েছিলো নাঈম আশরাফের। নাঈম বলেছিলো সাফাত ও সে ২৮শে মার্চ সিলেটে যাবে। জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা পুলিশ তথ্য পেয়েছে ওই দিন ইয়াবা সেবন করেছিলো সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ।

যদিও শুরুতে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলো সাফাত আহমেদ। বলেছিলো সে মদ পান করে, ইয়াবা না। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তার বান্ধবীর সংখ্যা অনেক। অন্তত ২৪ জন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কথা জানা গেছে।

তাদের অনেকেই পরিচিত মুখ। তবে দুই তরুণী ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইসমত আরা এমি বলেন, রেইনট্রি হোটেলের ওই ধর্ষণ মামলার তদন্তের স্বার্থে যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ধর্ষণের অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদ, তার গাড়ি চালক বিল্লাল, গানম্যান রহমত ও নির্যাতিতা দুই তরুণীর বন্ধু সাদমান সাকিফকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে দুই ছাত্রী ধর্ষণের মামলার অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। এ নিয়ে অভিযুক্ত পাঁচ আসামিকেই গ্রেফতার করা হলো।

এর আগে গত সোমবার (১৫ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর নবাবপুর রোডের ইব্রাহীম হোটেল থেকে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০ এবং গুলশান থেকে তার দেহরক্ষী আযাদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

তারও আগে চলতি মাসের ১১ তারিখে সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয় প্রধান আসামি সাফাত আহমেদ এবং সাদমান সাকিফকে।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের হালিম ঢাকায় নাঈম আশরাফ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা চালাচ্ছিলেন বলে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর প্রকাশ পায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, আজ রাতে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দল ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে নাঈম আশরাফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে এখন ঢাকায় আনা হচ্ছে।

এর আগে গত সোমবার এই মামলার আরও দুই আসামি আপন জুয়েলার্সের মা লিকের ছেলে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল ও তার দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর নবাবপুর রোডের ইব্রাহীম হোটেল থেকে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০। এছাড়া গুলশান থেকে সাফাতের দেহরক্ষী আযাদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

গত ৬ মে এক তরুণী মামলা করার পাঁচদিন পর ১১ মে রাতে সিলেট থেকে প্রধান আসামি সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু সাদমান সাকিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরই মধ্যে তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

এ নিয়ে মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে সবাইকে গ্রেপ্তার করল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর আগে গণমাধ্যমে নাঈমের ছবি দেখে তাকে হালিম বলে শনাক্ত করেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের গাইন্দাইল গ্রামের বাসিন্দারা। হালিম ওই গ্রামের ফেরিওয়ালা আজমদাজ হোসেনের ছেলে। এলাকায় প্রতারক হিসেবে তার পরিচয় ছিল।

গ্রামবাসী ভাষ্য, হালিম প্রভাবশালী বিভিন্ন জনকে তার বাবা পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা আদায় এমনকি বিয়েও করেছিল দুই বার।

ঢাকায় এসে নাঈম আশরাফ নাম নিয়ে ‘ই-মেকার্স’ নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ২০১৪ সালে ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী অরিজিৎ সিংয়ের কনসার্টের আয়োজন করেন তিনি।

২০১৬ সালে ঢাকায় ভারতের আরেক শিল্পী নেহা কাক্কারকে নিয়ে ‘নেহা কাক্কার লাইভ ইন কনসার্ট’ অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেন নাঈম বা হালিম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাঈম বিভিন্ন জনের সঙ্গে নিজের সেলফি দিতেন, যা সুবিধা নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হত বলে এখন মনে করছেন ওই ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা।

নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে হালিম এলাকায় পোস্টার-ব্যানারও লাগাতেন; যদিও সংগঠনে তার কোনো পদ ছিল না বলে জানান স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাজীপুরের নেতারা।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাতের সঙ্গে নাঈমের নিবিড় ঘনিষ্ঠতার কথা সাফাতের সাবেক স্ত্রী ফারাহ মাহবুব পিয়াসাও জানিয়েছেন।

গত ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ৪০ দিন পর গত ৬ মে এক তরুণী বনানী থানায় একটি মামলা করেন।

বনানীর ‘দ্যা রেইন ট্রি’ হোটেলের জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রণ করে ওই দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ৬ মে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এতে পাঁচ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৮ মার্চ রাত ৯টার দিকে রেইনট্রি হোটেলে আহমেদ শাফাতের জন্মদিনের নিমন্ত্রণে যান ওই দুই তরুণী। মধ্যরাতে জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শাফাত ও নাঈম হোটেলের দুটি কক্ষে আটকে রেখে তাদের ধর্ষণ করে। সাদমান সাকিফ, বিল্লাল ও আজাদ ধর্ষণে সহায়তা করেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ

আলোচিত ধর্ষকের সাথে ‘সখ্যতার’ দোষেই একুশে টিভি থেকে চাকরি হারালেন ফারহানা নিশো ?

ধর্ষিত তরুণীর লোমহর্ষক বর্ণনায় ভিডিওতে দেখুন হোটেল রেইনট্রিতে সেই রাতে আসলে কি ঘটেছিল!

রিমান্ডে থাকা দুই ধর্ষক সাফাত ও সাদমানের ‘চাহিদা’ পূরণে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নাকাল অবস্থা!

আপন জুয়েলার্স বন্ধ করতে হলে দেশের সব জুয়েলার্স বন্ধ করতে হবে: দিলদার

বনানীর ধর্ষণ মামলা: অভিযুক্ত আসামির সঙ্গে ধর্ষিতা তরুণীর কথোপকথন প্রকাশ

বনানীর সেই আলোচিত ঘটনা ‘ধর্ষণ নয়, আপসে’

দুই তরুণীকে ধর্ষণের পর গর্ভনিরোধক ওষুধ খাওয়ায় সাফাত ও নাঈম

দুই ছাত্রী ধর্ষণ: ফেঁসে যাচ্ছেন বনানী থানার ওসি ফরমান!

‘ধর্ষণ করছে তো কি হইছে? জোয়ান পোলা একটু-আধটু তো এসব করবই, আমিও করি’