বিলীনের পথে মোগল ঐতিহ্যের চমকপ্রদ সব ইতিহাসের সাক্ষী ‘পাক্কা বাড়ি’

মশিউর দিপু, মেহেন্দিগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি, সময়ের কণ্ঠস্বর-

প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের উদাসীনতা আর স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলার কারণে প্রায় সাড়ে ৩শ’ বছরের পুরাতন মেহেন্দিগঞ্জের পাক্কা বাড়িটি আজ বিলীনের পথে। নদী বেষ্টিত বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চরএককরিয়া ইউনিয়নে মোগল আমলের ঐতিহ্যবাহী পাক্কা বাড়িটি অবস্থিত।

স্থানীয় সত্তোরর্ধো আ. খালেক বিশ্বাস  বলেন, এটি মোগল আমলে নির্মিত। আবার অনেকে বলেন, পুরার্কীতিটি মুসলিম শাসনামলে নির্মিত। তারা সকলে বলছেন- ছোট বয়স থেকেই বাড়িটি এ রকমই দেখে আসছি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা ও জানা যায়, ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ২১ ফুট প্রস্তের ২ ফুট ১ ইঞ্চি ব্যাসের চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত হয়েছে ওই পাক্কা বাড়ি। এটি ৬ কক্ষের দ্বিতল বাড়ি। পাক্কা বাড়িকে ঘিরে চারপাশে রয়েছে প্রাচীর, সামনে বড় দিঘী, দোতালায় ওঠার সিড়ির নিচে অন্ধ কুপ, সিড়ি কোঠা লাগোয়া দেয়ালে ৬ ইঞ্চি ব্যাসার্ধ গোলাকার ছিদ্র (যা দিয়ে হয়তো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হত) ভিতরে প্রবেশ গেট, সামনে পুকুর থাকা সত্ত্বেও দোতালায় চৌবাচ্চা রয়েছে, স্থানীয়রা যাকে বলে জল পুকুর।

বাড়িটির সুড়ঙ্গে ঢোকার গোপন দরজাটির উচ্চতা ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি, বাড়িটি নির্মান করতে ব্যাবহার করা হয় একাধীক প্রকারের ইট। বাড়িটির গঠন প্রনালী দেখে এটিকে একটি প্রাচীন দূর্গ বলে মনে হয়। বাড়িটির অবকাঠামো দেখে মনে হয় যারা তৈরি করেছিল তারা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যই চারদিকে দেয়াল ঘেরা বাড়ি বা দুর্গটি তৈরি করেছিলেন।

তবে পার্শবর্তি ভোলা জেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে জানা যায়, ভোলার আদি নাম দক্ষিণ শাহবাজপুর। আর সেখানকার ইলিশা নদীর উত্তরাংশে আজকের মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা ও মুলাদী নিয়ে তৎকালীন নাম ছিল উত্তর শাহবাজপুর। ওই দুই জনপদে পুর্তুগিজ ও আরকান জলদস্যুদের তান্ডব ছিল ব্যাপক হারে। জলদস্যুরা নারী নির্যাতন, হত্যা, লুন্ঠন, দুর্বল মানুষদের দাস-দাসী বানিয়ে বিক্রি করার এক ভয়াবহ রাজত্ব কায়েম করেছিল। ওই জলদস্যুদের শায়েস্তা করার জন্য সম্রাট  আকবর ১৫৮৩ খৃষ্টাব্দে তার সাবেক সেনাপতি শাহবাজ খানকে এ অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সাহসিকতার সাথে জলদস্যুদের পরাস্ত করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনেন এবং তার নামানুসারে বর্তমান ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা ও মুলাদী দক্ষিণ ও উত্তর শাহবাজপুর নামে পরিচিতি পায়।

শাহবাজ খান চলে যাওয়ার পর উত্তর শাহবাজপুরের বৃহত্তামাংশে বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জে আসেন সম্রাট আকবরের আরেক সেনাপতি আঁগা মেহেদী। তিনিও সাহসিকতার সাথে জলদস্যুদের প্রতিহত করেন এবং তার নামানুসারে উত্তর শাহবাজপুরের বৃহত্তম অংশের বর্তমান মেহেন্দিগঞ্জ তার নামে নামকরন করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মোগল সম্রাট দের প্রতিনিধিরা এসেছেন, রাজত্ব করতে গিয়ে গড়েছেন প্রাসাদ রাস্তা-দিঘী, মসজিদ, মন্দির ও গির্জা। কিন্তু পাক্কা বাড়ির আশে-পাশে মোগল আমলের কোন মসজিদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে আনারস বাগানের চিহ্ন। আনারস বাগানের চিহ্ন দেখে মনে হয় পাক্কা বাড়িটি মোগল আমলের হলেও সেটি শাহবাজ খান বা আগা মেহেদীর আমলে তৈরি নয়। বরং মোগল শাসকদের থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যই পুর্তুগিজ বা আরকান জলদস্যুরা এটি নির্মান করেছিল।
পাক্কা বাড়ি বিষয়ে স্থানীয় ষাটউর্ধো বৃদ্ধ আসলাম আলী হাওলাদার সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ছোট বেলা থেকে বাড়িটি এমনই দেখে আসছি, এখন বাড়িটির দেয়ালে গাছপালা জন্মে  বাড়িটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাড়িটির পিছনে অনেক রহস্য রয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্যে রিপন হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, পাক্কা বাড়ির আশেপাশে অনেক বসতি গড়ে উঠেছে, বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও সামনের দিঘী সহ চারপাশের যায়গা স্থানীয়রা দখল করে নিয়েছে।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় মোগল আমলের ঐতিহাসিক পাক্কা বাড়ি। ছবি, মশিউর দিপু, সময়ের কন্ঠস্বর

এ বিষয়ে চর এককরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মকিম তালুকদার সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ঐতিহাসিক এই বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষনের জন্য ইতিপূর্বে কয়েকবার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগকে অবহিত করা হলেও এখন অব্দি বাড়িটি সংস্কারের জন্য কোন উদ্যেগ নেয়া হয়নি।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আলীমুল্লাহ সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, আমি বাড়িটি সম্পর্কে ততটা বিস্তারিত জানি না। স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে এ বিষয়ে আলাপ করে প্রত্নতাত্ত্বিকঅধিদপ্তর কে অবহিত করা হবে বলে তিনি জানান।

বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাষ্টরিয়ান শাহিন আলম সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, দেশে কোন পূরাকৃতির সন্ধান পেলে আমরা সেখানে সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংরক্ষনের উদ্যেগ নেই। মেহেন্দিগঞ্জে মোগলদের ব্যাপক বিচরন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাড়িটির সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, সবচেয়ে ভালো হয় বাড়িটি সংরক্ষনের দাবী জানিয়ে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় অথবা ডিজি ঢাকা বরাবর একটি আবেদন করলে।

এ দিকে স্থানীয়রা মনে করেন ঐতিহাসিক মোগল আমলের স্থাপত্য কৃতি পাক্কা বাড়িটি সংস্কার করা হলে প্রাচীনতম এই বাড়িটি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।

 

Leave a Reply