নরসিংদী জেলা হাসপাতাল: ‘বাইরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট’

মো. হৃদয় খান, স্টাফ রিপোর্টার: বাইরে থেকে পরিচ্ছন্ন দেখা গেলেও নরসিংদী জেলা হাসপাতালটির ভেতরের পরিবেশ কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি রোগীদের সহ্য করতে হয় ছারপোকার কামড়। এক্স-রেসহ বিভিন্ন পরীক্ষা হাসপাতালে বন্ধ থাকায় রোগীরা ছুটছে অন্যত্র। দালালদের মাধ্যমে অনেকেই প্রতারিত ও হয়রানির শিকার হচ্ছে।

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের সামনে গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় দেখা যায় বেজায় ভিড়। রোগী দেখা চলছে ধীরলয়ে। রায়পুরা উপজেলার রাধাগঞ্জ থেকে শিশু নিয়ে আসা গৃহবধূ লিপি আক্তার বিরক্ত এ অবস্থায়। তিনি জানালেন, চার দিন আগে বাচ্চা নিয়ে এলে আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষার জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তা কারাতে বলেছেন নিউ ব্রিটিশ বাংলা প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে। পরীক্ষা ডাক্তারের পছন্দের জায়গায় না করালে রোগী দেখা হয় না বলে তিনি শুনেছেন। এ অভিযোগের সত্যতা জানতে ডা. ইসরাত জাহান এ্যানির মুখোমুখি হলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের আশপাশের রিপোর্ট অস্পষ্ট হয়। তাই পরীক্ষার জন্য অন্যত্র যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।’ গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করে ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এ রকম অসংখ্যা চিকিৎসা হয়রানি ও বিড়ম্বনার চিত্র।

সকাল সাড়ে ৮টায় হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের জন্য টিকিট বিক্রি শুরু হলেও তখন দেখা মেলেনি চিকিৎসকদের। ৯টার পরও চিকিৎসকশূন্য দেখা গেছে বেশির ভাগ কক্ষে। অথচ বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীসহ স্বজনরা। এ সময় ডা. জসিম উদ্দিন ও ডা. ইসরাত জাহান এ্যানিকে শিশু ওয়ার্ডে, ডা. ফারুক হোসেনকে সার্জারি ওয়ার্ডে, ডা. আবদুল রাজ্জাককে মেডিসিন ওয়ার্ডে ও ডা. কাজী নাজমা বেগমকে গাইনি ওয়ার্ডে দেখা যায়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ও হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমান, মেডিক্যাল অফিসার ডা. কামরুল হাসান, ডা. রামচন্দ্র, ডা. শওকত হাসান খান, ডা. আমিনুল ইসলাম, ডা. ইসফাক মেহেরুবিন, গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সাকিলা শারমিন তখন রোগী দেখা শুরু করেন।

কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের বারান্দায় দেখা যায় ডা. রাজ্জাককে। তিনি বলেন, ‘আমি রন্ধনশালার দায়িত্বে রয়েছি। তাই প্রতিদিন হাসপাতালে প্রবেশ করেই রন্ধনশালার খোঁজখবর নিই। এ জন্য রোগী দেখতে দেরি হয়।’

শিশু ওয়ার্ডের সামনে অপেক্ষমাণ পলাশ উপজেলার চরনগরদী থেকে আসা আকলিমা আক্তারের কোলে ১৪ দিন বয়সের শিশু জাকারিয়া। কয়েক দিন ধরে ঠাণ্ডা, কাশি ও জ্বরে ভুগছে। সকাল থেকে বসে থাকায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন।

সকাল ৯টা ২০ মিনিটে রোগী দেখা শুরু করেন অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। দেরিতে চেম্বারে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকাল ৮টায়ই হাসপাতালে আসি। ওয়ার্ডে রোগী দেখে বহির্বিভাগে বসতে বসতে ১০টা বেজে যায়।

সকাল পৌনে ১১টার দিকে শিশু বিভাগের ২০৩ নম্বর কক্ষের সামনে দেখা যায় প্রায় অর্ধশত রোগীর অপেক্ষা। শহরের বাগদী এলাকার সোহেল প্রশ্ন করেন, ‘সব ডাক্তারই কি ওয়ার্ডে রোগী দেখছেন?’

দুপুর ১২টার দিকে অর্থোসার্জারি বিভাগের জুনিয়ার কনসালট্যান্ট ডা. শহিদুল ইসলামের কক্ষের সামনে রোগীদের জটলার পাশাপাশি উত্তেজনা দেখা যায়। আফসার উদ্দিন নামের এক রোগী বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টায় আইছি, ডাক্তার দেখাতে পারি নাই। আর এখন আইয়্যা দালাল রে টাকা দিইয়্যা আগে ডাক্তার দেখাইয়্যা চইল্যা যাচ্ছে অনেকে।’ এই সময় তাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে রোগীরা বলে, এই লোক তিন-চারজনকে পেছন থেকে আগে নিয়ে ডাক্তার দেখাইছে। তাজুলের পরিচয় জানতে চাইলে প্রথমে হাসপাতালের স্টাফ পরিচয় দেন, পদবি জানতে চাইলে বলেন, ‘আসলে আমি পৌরসভায় চাকরি করি।’

সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্যাথলজি বিভাগের বেশির ভাগ পরীক্ষা হাসপাতালে হয় না। রেডিওলজিস্ট অবসরে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে এক্সরে বিভাগ। একই অবস্থা আল্ট্রাসনোগ্রাম বিভাগের। এদিকে কাগজের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে ইসিজি।

এদিকে হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে রয়েছে রোগীদের বিস্তর অভিযোগ। শিশুসহ নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের বেডগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আর সব ওয়ার্ডেই ভয়াবহভাবে বংশ বিস্তার করেছে ছারপোকা। বেডের বিছানা ওল্টালেই দেখা মেলে অসংখ্য ছারপোকা। সেই সঙ্গে বেডে ময়লা চাদর ও বালিশ তো রয়েছেই।

পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সৈয়দনগরের মাছুম মোল্লা বলেন, ‘পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হইছি। এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাইনি। আর খাবার হিসেবে পাঙ্গাশ মাছ আর ডাল দেয়, তা খাওয়ার উপযুক্ত নয়।’

আরেক রোগী আবদুল করিম বলেন, ‘ওয়ার্ডে ছারপোকা বাসা বেঁধেছে। এগুলো শরীরে কামড়ায়। নার্সদের বললে খেপে যান। তাঁরা বলেন, ভালো না লাগলে চলে যান।’

মেডিসিন বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘রোগীরা খাবার যেখানে সেখানে ফেলেন। এ জন্য ছারপোকা দ্রুত বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করেও তা দূর করতে পারছি না।’

এদিকে মহিলা ওয়ার্ড-১-এ (শিশু ও নারী) গিয়ে দেখা যায়, শিশুদের জন্য ১৭টি বেড বরাদ্দ থাকলেও শিশু রোগী ভর্তি রয়েছে ৩৮টি। ফলে বেডে স্থান সংকুলন না হওয়ায় মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের।

এদিকে দুপুর ১টায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আবুল খায়েরকে স্বজনরা হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল। কারণ জানতে চাইলে বড় ভাই মাসুদ মিয়া বলেন, ডাক্তাররা ঢাকায় নিতে বলেছেন। কিন্তু দালালরা বলছে, প্রাইভেট হাসপাতালে নিলে ভালো করে দিতে পারবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শারমিন পাঠান বলেন, ‘রোগীটি হাতের পাশাপাশি মাথায় আঘাত পেয়েছেন। যেকোনো সময় রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। আমাদের হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থা নেই। তাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি।’

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেশির ভাগই এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাঁচ-সাতজন করে দালাল প্রতিদিন নির্বিঘ্নে হাসপাতালে ঘুরে বেড়ায়। তারা রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে নানা তৎপরতা চালায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালটি উন্নয়ন খাত থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে নিজস্ব জনবল রয়েছে মাত্র ৫৭ জন। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রেষণে বিভিন্ন হাসপাতালের ৫৯ জন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্তি করায় আমরা চিকিৎসাব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে পেরেছি। অনেক সময় সকালে কর্মবণ্টনের সভা হয়। এ কারণে চিকিৎসকরা যথাসময়ে এসেও নিজের কক্ষে যেতে পারেন না। আমরা হয়তো শতভাগ করতে পারব না, যথাসময়ে চিকিৎসকদের ৬০ শতাংশ উপস্থিতি করতে পারলেই সন্তুষ্ট।’

ওয়ার্ডে ছারপোকা ও নোংরা পরিবেশ এবং পরীক্ষা নিয়ে জানতে চাইলে ডা. মিজানুর রহমান আরো বলেন, ‘বিষয়টি আমরা ওয়াকিবহাল। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আন্তরিকতার অভাব নেই। আশা করি মাসখানেকের মধ্যে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

দালাল প্রসঙ্গে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সিভিল সার্জনের পাশাপাশি পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে চিকিৎসক কিংবা কোনো স্টাফ যদি এই কাজে জড়িত থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’