মন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময়েও শেষ হয়নি সিরাজগঞ্জের মহাসড়কগুলোর মেরামত কাজ

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ জেলার সবকটি মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ১০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সেই সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত জেলার প্রায় সবকটি মহাসড়কেই থেকে যাচ্ছে খানাখন্দ। আঞ্চলিক সড়কেরও বেহাল অবস্থা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-ঢাকা, হাটিকুমরুল-বনপাড়া ও বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কে ইট দিয়ে ‘হেরিংবোন থেরাপি’ চালু রেখেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। ফলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, প্রবল বৃষ্টিতে জেলার হাটিকুমরুল মোড়, উল্লাপাড়া, চান্দাইকোনা-ঘুড়কা ও হাটিকুমরুল-বনপাড়া, মহিষলুটি-খালকুলা মহাসড়কের বিটুমিন ও পাথরের মিশ্রণ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। হাটিকুমরুল মোড়ে মাস কয়েক আগে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার করার এক সপ্তাহ পরই নতুন করে আবার খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এসব মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনার দিকে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ঈদের ছুটিতে সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির চাপ আরো বেড়ে যায়। এতে সড়কের ওপর অবস্থা আরো বেহাল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সড়কেরও একই হাল। সয়দাবাদ-বেলকুচি-এনায়েতপুর সড়কের উপরিভাগের পাথর ও বিটুমিনের মিশ্রণ উঠে গিয়ে শতাধিক ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একই অবস্থা শিয়ালকোল-নলকা, তাড়াশ-রানীরহাট-বারুহাস, তাড়াশ-নিমগাছী-ভুইয়াগাঁতী, উল্লাপাড়া-লাহিড়ী মোহনপুরসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের। তার ওপর গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অবস্থা আরো বেহাল। জেলার মহাসড়কে খানাখন্দের কারণে একদিকে যেমন দুই থেকে তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনাও।

গত ৯ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সিরাজগঞ্জে মহাসড়ক পরিদর্শনে যান। সেই সময় তিনি হাটিকুমরুল মোড়ের খানাখন্দ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাৎক্ষণিক সওজের সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফাকে প্রত্যাহার এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু রওশন এবং পাবনা অঞ্চলের অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে শোকজ করেন সেতুমন্ত্রী।

এ সময় জেলার সবকটি মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামতে সর্বোচ্চ ১০ দিনের সময় বেঁধে দেন সেতুমন্ত্রী। সেই সময়সীমা গত ১৯ আগস্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু মহাসড়কগুলোর বেহাল অবস্থার তেমন কোনো উন্নতিই হয়নি। বৃষ্টির কারণে প্রতিদিনই নতুন করে খানাখন্দ সৃষ্টি হচ্ছে। এবড়ো খেবড়ো মহাসড়কের অনেক স্থানেই সওজের ‘হেরিংবোন থেরাপি’ উঠে বের হচ্ছে রাস্তার কঙ্কাল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের সিরাজগঞ্জের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রী ১০ দিনের সময় বেঁধে দিলেও বৃষ্টির কারণে সেই ডেডলাইন মানা সম্ভব হয়নি। তিন থেকে চার দিন ভালোভাবে বিটুমিনের কাজ করতে হবে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেটা এখন সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, হাটিকুমরুল মোড় থেকে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের চান্দাইকোনার দিকে ১৭ কিলোমিটার সড়কের খানাখন্দে ইট দিয়ে ‘হেরিংবোন’ করা হলেও বৃষ্টিতে আশপাশে ফের নতুন নতুন গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেসব অংশেই মেরামত চলছে। জেলার সবকটি মহাড়কের পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়কেও অসংখ্য পটলস ও খানাখন্দ রয়েছে। সেসবও মেরামত করা হচ্ছে।

সওজের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে গোলচত্বরের দিকে নলকা পর্যন্ত মহাসড়ক প্রতি মাসেই সেতু কর্তৃপক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ করে। তাদের আধুনিক মেশিনপত্র ও যথাযথ বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু আমাদের সে ধরনের মেশিনারিজ বা বরাদ্দও নেই। সওজ থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ের জন্য সম্প্রতি ছয় কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী (যিনি প্রত্যাহার হয়েছেন) আমাকে মাত্র এক কোটি ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই অল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে সেটা সম্ভব হয়নি।’ ‘‘সওজের নিজস্ব বিটুমিন মেশানোর জন্য ‘হট মিক্সিং প্ল্যান্ট’, ‘গ্রেডার মেশিন’ এবং ‘এক্সক্যাভেটর’ প্রয়োজন। সেসব নাটোর, বগুড়া ও রাজশাহী জেলায় আছে। কিন্তু আমাদের ভাড়া করে নিয়ে আসতে হয়।’’

সিরাজগঞ্জ সওজের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হায়দার বলেন, ‘ঈদে সামনে রেখে আমরা দ্রুতগতিতে সংস্কার কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু আবহাওয়ার প্রতিকূলতা কাজের গতি কমাতে পারে। যদি আবহাওয়া ঠিক থাকে, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যে রিপিয়ারিং কাজ শেষ করতে পারব।’

মোফাজ্জল হায়দার জানান, হাটিকুমরুল মোড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি ভাগে ‘ক্লোভার-লিফ’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নলকা থেকে সিরাজগঞ্জ শহর হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে মুলিবাড়ী পর্যন্ত চার লেন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্যই কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করা হবে।

সওজের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু রওশন বলেন, সিরাজগঞ্জের ন্যাশনাল হাইওয়ে (এন-৫) বা মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামত ও সংস্কারের জন্য ছয় কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেসব অর্থ যথাযথ খরচ না করে লোপাট করা হয়েছে এমন অভিযোগে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৯ আগস্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রত্যাহার করেন। এমনকি তাদেরও শোকজ করেন।

আবু রওশন আরো বলেন, ‘বর্তমানে সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক জরুরিভাবে খানাখন্দ মেরামত করা হচ্ছে। যেহেতু মন্ত্রী নিজেই দেখে গেছেন, তাই এসব মেরামত ও সংস্কারের জন্য জন্য বিশেষ বরাদ্দও দেওয়া হবে। আমিও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও তদারকি করছি। মাঝে মধ্যেই বৃষ্টির কারণে মেরামত কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কাদের জিলানী বলেন, সিরাজগঞ্জ জেলার তিনটি মহাসড়কের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। তার ওপর বৃষ্টির কারণে আরো বেহাল। ঈদের আগে এসব মহাসড়কে যাত্রী দুর্ভোগ বাড়বে।