রোগীর চাপে ডাক্তার ও নার্সদের নাভিশ্বাস

আরাফাতুজ্জামান, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও ঝিনাইদহ জেলার প্রায় ১৭ লাখ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

যদিও হাসপাতালটি প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার ও নার্স সংকট রয়েছে। রয়েছে রোগীদের চরম শয্যা সংকট। তারপরও চলতি বছরের গত সাত মাসে এক লাখ ৮৮ হাজার রোগীকে সেবা প্রদান করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।

প্রতিদিন ভর্তি ও বর্হিঃবিভাগে গড়ে ১২’শ করে রোগীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে, যা ডাক্তারদের পক্ষে কুলিয়ে আর ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতি মাসে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ২৬ হাজার ৮৯৩ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে একশ বেডের ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রোগীর এই ক্রমাগত চাপ ও চিকিৎসা নজীর বিহীন। রোগীর চাপে ডাক্তার ও নার্সদের নাভিঃশ্বাস উঠেছে। দিনকে দিন এই রোগীর চাপ চিকিৎসকদের সুস্থ ও নির্বিঘ্নে রোগী দেখার মানসিকতাকে বিপর্যস্থ করে তুলছে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ১৪ হাজার ৫১ জন মহিলা রোগী ও ৬ হাজার ৭০১ জন পুরুষ রোগী ভর্তি হয়েছে। ওই সাত মাসে বর্হিঃবিভাগ ও জরুরী বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ ৮৮ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে শিশু রোগী রয়েছে ৩৮ হাজার ২৪৪ জন, পুরুষ রোগী ৫৭ হাজার ১৭ ও মহিলা রোগী ছিল ৯২ হাজার ৯৯১ জন। এ সময়ে বিষপান, গলায় রশি, ষ্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা, ডায়ারিয়াসহ বিভিন্ন রোগে মৃত্যু বরণ করেছেন ২৮৯ জন রোগী। এর মধ্যে পুরুষ রোগী রয়েছে ১৬০ জন ও মহিলা রোগী রয়েছে ১২৯ জন।

ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস সুত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ডাক্তারদের ৪১টি পদের মধ্যে আছে ২৯ জন। ১২ জন চিকিৎসকের পদ শুন্য থাকায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ আইয়ুব আলী জানান, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ৩/৪টি অপারেশন করার পর আবার বর্হিঃবিভাগে শতাধীক রোগী দেখতে হয়। এর বত্যায় ঘটলে দুর্নাম ছড়ানো হয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, অপারেশন থিয়েটারে ৩/৪টি রোগী অপারেশনের পর কি আর রোগী দেখার ধৈর্য্য থাকে ? কিন্তু তারপরও অহরহ প্রতিদিন ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের ডাক্তারদের এই কাজটিই করতে হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন যে হারে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই তুলনায় লোকবল নেই। ফলে পান থেকে চুন খসলে ডাক্তারদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করার রেওয়াজ তৈরী হয়েছে। কিন্তু ভাল কাজে আমাদের কেও প্রশংসা করেন না।

হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ডাঃ ইমদাদ বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও বিভিন্ন বিভাগ আলাদা করে এখন চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সব ওয়ার্ডেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। লোকবলের অভাব পুরণ না করলে রোগীর চাপে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ছি। শহর গ্রাম ও পাশের জেলা থেকেও ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রোগীরা ছুটে আসছে। আমরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি সেবা দেওয়ার।

ঝিনাইদহ বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ডাঃ দুলাল কুমার চক্রবর্তী বলেন, এই মুহুর্তে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রোগীর যে চাপ তাতে জরুরী বিভাগ, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, আউটডোরে রোগীর উপস্থিতির আনুপাতিক হারে ডাক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি না করলে মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক এমএলএসএস পর্যন্ত পায় না, সেখানে সেবার মান কি আর হবে। তিনি দ্রুত ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত নার্স, আয়া, এমএলএসএস ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদ সৃজন করে রোগীদের সেবার মান বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।