পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঈদুল আজহায় যা কিছু করণীয় ও বর্জনীয় আপনার

ইসলাম ডেস্ক, সময়ের কণ্ঠস্বর –
রাত পোহালেই পবিত্র ঈদ। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা।

এই ঈদে চাঁদ দেখা নিয়ে দোদুল্যমানতা নেই। আগেই নির্ধারিত হয়েছে তারিখ। সে অনুযায়ী আগামীকাল ১০ জিলহজ শনিবার পবিত্র ঈদুল আজহা, কোরবানির ঈদ।

ঈদের নামাজ শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করবেন সামর্থ্যবান মুসলমানরা।

ঈদুল আজহার সঙ্গে পবিত্র হজের সম্পর্ক রয়েছে। বৃহস্পতিবার পবিত্র নগরী মক্কার অদূরে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায় হজ পালন করেছেন।

স্থানীয় হিজরি মাস গণনা অনুযায়ী আজ সৌদি আরবে ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। সকালে মুজদালিফা থেকে ফিরে হাজীরা মিনায় অবস্থান করে পশু কোরবানিসহ হজের অন্য কার্যাদি সম্পাদন করবেন।

ঈদুল আজহা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইলের (আ.) সঙ্গে সম্পর্কিত। হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি করতে গিয়েছিলেন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আদেশ ছিল হজরত ইব্রাহিমের জন্য পরীক্ষা। তিনি পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশে জবাই করার সব প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফলে সঙ্গে সঙ্গে পুত্র ইসমাইলের পরিবর্তে পশু কোরবানি করার নির্দেশ আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।

সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই হজরত ইব্রাহিমের (আ.) সুন্নত হিসেবে পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে কোরবানির বিধান এসেছে ইসলামী শরিয়তে। সেই মোতাবেক প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য পশু কোরবানি করা ওয়াজিব।

ইসলামে কোরবানি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে সূরা কাউসারে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল আজহার দিন কোরবানির চেয়ে আর কোনো কাজ আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয় নয়।গরু, মহিষ, উট, ভেড়া. ছাগল, দুম্বাসহ যে কোনো হালাল পশু দিয়ে কোরবানি দেয়া যায়।

ঈদুল আজহা ত্যাগ ও আনন্দের দিন। ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এ দিনকে ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা সুসজ্জিত করেছে। এ দিনের রয়েছে করণীয় ও বর্জনীয়।

ঈদুল আজহায় করণীয়

গোসল করা : ঈদের সালাতের আগে গোসল করা সুন্নাত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)

উত্তম পোশাক পরিধান : ঈদের দিন রাসুল (সা.) ভালো পোশাক পরিধান করতেন। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.)-এর লাল ও সবুজ ডোরার একটি চাদর ছিল, তিনি তা দুই ঈদ ও জুমার দিন পরিধান করতেন।

সুগন্ধি ব্যবহার : সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত। আর ঈদের দিনে রাসুল (সা.) বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। রাসুল (সা.)-এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোশাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চাই।

ঈদের দিনে খাওয়া : কোরবানির দিনে ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। নবী করিম (সা.) ঈদুল আজহার দিন কিছুই খেতেন না, যে পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করতেন। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে একপথ দিয়ে যাওয়া ও অন্যপথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত। (বুখারি, হাদিস : ৯৮৬) সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়াও সুন্নাত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১০৭১)

তাকবির পাঠ করা : ঈদের দিন তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করা সুন্নাত। পুরুষরা এ তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নীরবে। এ তাকবির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পাঠ করবে। (ফাতহুল বারি : ২/৫৮৯)

ঈদের নামাজ আদায় : ঈদের নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ঈদের নামাজ সব নফল নামাজের মধ্যে ফজিলতপূর্ণ। ঈদের নামাজের আগে ও ফজরের নামাজের পরে কোনো নামাজ নেই। ঈদের নামাজের কোনো আজান ও ইকামত নেই।

শুভেচ্ছা বিনিময় : ঈদের দিনে ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত। ঈদের দিনে সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ছিল—‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’।

কোরবানি করা : ঈদুল আজহার দিনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানির গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া-তোহফা দেবে ও গরিব-মিসকিনকে দান করবে। মুস্তাহাব হলো, কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা। ১. নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য এক ভাগ। ২. আত্মীয়-স্বজনের জন্য এক ভাগ। ৩. দরিদ্রদের জন্য এক ভাগ। আর যদি পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হয়, তাহলে কোরবানির সব গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। (শামী ৫/২০৮)

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা : ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয়, সে দিকে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক হওয়া উচিত। কোরবানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিতে হবে। বেশির ভাগ লোকই নিজস্ব জায়গায় পশু জবাই করে। এতে করে অলিগলিতে বর্জ্য যেমন পড়ে, তেমনি রক্ত পড়ে দূষিত হয় পরিবেশ, চলাচলের অনুপযোগী হয় রাস্তাঘাট। তাই ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা পরিষ্কারে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ গ্রহণ করে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।

ঈদুল আজহায় বর্জনীয়

ঈদের দিনে রোজা : ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা : ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে জিয়ারত করা বিদআত (সহিহ ফিকহুস সুন্নাহ : ১/৬৬৯), তবে পূর্বনির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ জিয়ারত করলে দোষণীয় নয়।

ঈদের সালাত আদায় না করে শুধু আনন্দ-ফুর্তি করা : অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত ও কোরবানি করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।

মুসাফাহা-মুআনাকা এ দিনে জরুরি মনে করা : ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাৎ হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে—এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদআত। তবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মুআনাকা (গলায় গলা মিলানো) করায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলী (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে এলেন, তিনি তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরেন ও মুআনাকা (কোলাকুলি) করেন। ’

কোরবানির কোনো কিছু বিক্রি করা : কোরবানির গোশত, চামড়া ও এর কোনো অংশ বিক্রি করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রি করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিকস্বরূপ গোশত দেওয়া নিষিদ্ধ। (বুখারি, হাদিস : ১৭১৭, মুসলিম, হাদিস : ১৩১৭) তবে সাধারণভাবে তাকে খেতে দেওয়ায় অসুবিধা নেই।

গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখা : ঈদের দিন উপলক্ষে যেখানে গান-বাজনা, অবাধে নারী-পুরুষ বিচরণ ইত্যাদির আয়োজন থাকে, এমন মেলা আয়োজন করা, অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়িঘরে গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাৎ ও অবাধে যেখানে-সেখানে ঘোরাফেরা অমুসলিমদের কালচার। মুসলিমদের জন্য এগুলো সম্পূর্ণ হারাম। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৯, সুরা লুকমান, আয়াত : ৬, ৭)