রোহিঙ্গাদের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে রাখাইন ছাড়তে মাইকিং

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- মায়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ যেন কোনো মতেই থামছে না। রাখাইন রাজ্যে অবশিষ্ট যেসব রোহিঙ্গা এখনো দুঃসাহসের সঙ্গে রয়ে গেছেন তাদের আগামী ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবারের মধ্যে এলাকা ছাড়তে আল্টিমেটাম দিয়ে মাইকিং শুরু করেছে সামরিক জান্তা।

দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে এ আহ্বান জানানো হচ্ছে। শনিবার বিকেলে শুরু হওয়া মাইকিং রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে মংডু, রাচিদং ও বুচিদং তিনটি শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

মায়ানমার ছাড়ার মাইকিংয়ে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বলা হচ্ছে যে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মায়ানমারে অবস্থানকারী সব রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগ করতে হবে। আরাকানের স্বাধীনতাকামী গ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) তথা আরসা একমাসের জন্য অস্ত্র বিরতি ঘোষণা দেয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষে এ মাইকিং শুরু হয়েছে।

জানা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাশূন্য পাড়ায় লাল পতাকা, রাখাইনে যেসব পাড়া আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে সেখানে লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রাচিদং জেলার ধইনচ্যা পাড়া, বুচিদংয়ের তামাবিল, কইল্যাভাঙ্গা, রাইচং, মংডু জেলার নারিনচং, মগ্নিপাড়া, সিকদারবিল, পেরামপ্রু, নাইছ্যাপুর, শীলখালী, ধুমছেপাড়া, কোয়াংসং ও আদং গ্রামসহ যেসব পল্লী রোহিঙ্গাশূন্য করা হয়েছে, ওসব এলাকায় সেনাবাহিনী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে লাল পতাকা ওড়াছে।

পাহারায় রাখা হয়েছে স্থানীয় রাখাইন যুবকদের। যাতে রোহিঙ্গারা সেখানে যেতে না পারে। ফলে বাধ্য হয়েই বন, জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতে যারা লুকিয়েছিল তারাও এখন বাংলাদেশমুখী হয়েছে। সবমিলেই সেখানে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে সেনাসদস্যরা। সব রোহিঙ্গাকে গ্রাম থেকে বাংলাদেশে চলে যেতে বলা হচ্ছে। না হয় গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। অনেককে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। গতকাল টেকনাফ হোয়াইংক্ষ্য লম্বাবিল পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, দলে দলে রোহিঙ্গা ঢুকছেন। সবার মুখে হতাশা-আতঙ্ক। প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো প্রবেশ করেছেন। ছড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন ক্যাম্প, পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতরে।

গত শনিবার মিয়ানমারের শিলখালী গ্রাম থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন হাফেজ আমিন (৩২)। গতকাল দুপুরে টেকনাফের হোয়াইংক্ষ্য লম্বাবিল এলাকায় কথা হয়েছে তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, “শনিবার সকাল থেকে রোহিঙ্গাদের চলে যেতে মাইকিং করছে সেনাবাহিনী। মাইকিংয়ে সেনাবাহিনী বলছে, ‘এটা তুদের দেশ নয়; বাংলাদেশ হলো তুদের দেশ। তুদের অনেক স্বজন বাংলাদেশে বসবাস করছে। ওখানে গিয়ে তুরা আশ্রয় নে তাড়াতড়ি। যদি এখানে (মিয়ানমার) থাকিস, তাহলে গুলি করে সবাইকে হত্যা করা হবে।’ এই মাইকিং শুনে শনিবার রাতেই টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইংক্ষ্য লম্বাবিল পয়েন্ট দিয়ে হাফেজ আমিনের সঙ্গে তার পরিবারের ১২ জন সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। ওই সময় শিশুসহ প্রায় দুই শতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছেন।”

মিয়ানমার বুচিদং এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌস বেগম (২২) বলেন, ‘বার্মায় থাকলে আমাদের হত্যা হবে বলে মাইকিং করছে সেনাবাহিনী। প্রতিটি রোহিঙ্গাগ্রামে মাইকিং করা হচ্ছে। এখন প্রাণে বাঁচতে মালামাল নিয়ে সীমান্ত হয়ে টেকনাফ ঢুকে পড়েছি।’ তার সঙ্গে রয়েছে ছোট তিনটি সন্তান। তারা হলো এক বছর বয়সী মারজান, আড়াই বছর বয়সী ইসমাঈল এবং চার বছর বয়সী নূরুল ইসলাম।

ফেরদৌস বেগমের স্বামী আহমদ মাঝি বলেন, ‘মাইকিং শুনে আমাদের গ্রামে হৈচৈ শুরু হয়। গ্রামের প্রায় সাড়ে ৫০০ পরিবার কান্নাকাটি শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবাই মালামাল নিয়ে সীমান্তে চলে আসি। এরপর রাতেই নৌকাযোগে নাফ নদী পার হয়ে লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি।’

গতকাল দুপুরে কথা হয়েছে লম্বাবিল সীমান্তে বৃদ্ধা সুলতানা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাইকিংয়ে হত্যার কথা শোনার পর সবাই সীমান্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে যার মতো করে বন-জঙ্গল ও সীমান্তে আশ্রয় নিই। রাতেই ছেলে নূরুসহ একদল রোহিঙ্গার সঙ্গে টেকনাফে চলে আসি।’

আরআই