‘আপনি সু চিকে লিখবেন রোহিঙ্গাদের কোন দোষ নেই, আমরা মুসলিম এটাই আমাদের অপরাধ’

মোশারফ হোসাইন তযু, কক্সবাজার টেকনাফ থেকে-  সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই ত্রাণবাহী গাড়ী নিয়ে কক্সবাজার টেকনাফের উখিয়াতে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রবেশ করি। আসা যাওয়ার পথে চোখে পরে রাস্তার দু’পাশে দু’হাত তুলে খাবারের অপক্ষোয় দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা।

পাহাড় কেটে উঁচু নিচু বিভিন্ন জায়গায় কালো কাগজে ছোট ছোট ঘরে ছেয়ে গেছে। এমন দৃশ্য এই প্রথম দেখা আমার। আমি অবাক এ কেমন দৃশ্য! নিশ্চিত আমার চোখ ভুল দেখছে! আসলে ভুল দেখিনি। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখছি।

পাহাড়-বন-জঙ্গল-জলাভুমি ও নদী পেরিয়ে জীবন বাচাঁতে চলে এসেছে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে। নিজের জন্মভিটা, সাজানো সংসার ছেড়ে ইচ্ছে করে আসেনি ওরা। চোখের সামনে কারও মা, কারও বাবা, কারও ভাই, কারও বোন কারও স্ত্রীকে গলা কেটে গুলি করে হত্যার দৃশ্য দেখে নিজের জীবন বাচাঁতে ভয়ে চলে এসেছে ওরা।

১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উখিয়ায় পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা নতুন শরণার্থী ক্যাম্পের ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গারা কাঁতরাচ্ছে। চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে রোহিঙ্গারা! কখন আসবে খাবার, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের বেশিই দেখা গেছে। অবাক চোখে অসহায়ের মতো উপড়ে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে ওরা। একদিকে পেটে ক্ষুধার জ্বালা অন্যদিকে প্রিয় স্বজনদের হারানোর সেই ভয়াবহ দৃশ্য চোখে ভেসে উঠছে হয়তো রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে প্রতিবেদক

শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা খাদ্য ও পানি সংকট, আবাসনের অভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত দেখা গেছে। কয়েকদিন ধরে দীর্ঘ ভয়ঙ্কর পথ পাড়ি দিয়ে আসা সকলেই কম-বেশী অসুস্থ। এর মাঝে পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব, সঠিক যত্ন না পাওয়া এবং খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুয়ে-বসে থেকে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ক্যাম্পের বাইরেও শত শত রোহিঙ্গা নারী-শিশু খোলা আকাশের নিচে, গাছের ছায়ায়, রাস্তার উপর বা দোকানের সামনেই ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে পড়ে আছে। প্রতিটি পরিবারে গড়ে অন্তত ৩-৪টি শিশু রয়েছে। এদের অনেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে শিশুদের উপযোগী খাবার জুটছে না।

নিজের দেশে মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, গত দুই সপ্তাহে রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ১০-১৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে আসার পথে কোনো রোহিঙ্গা পরিবারকে স্বাভাবিকভাবে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করতে দেখেননি বলছেন তারা। দুই একটি পরিবারকে তারা দেখেছেন, যারা বাংলাদেশে আসতে চান না। জঙ্গলে লুকিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আশায় আছেন তারা, যাতে আবার প্রিয় বাড়িটিতে ফিরতে পারেন।

চার দিন আগে মংডুর তুলাতলী থেকে আসা মো. ফারুক তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলছিলেন, তাদের এলাকার হাজার হাজার মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে নির্বিচারে গুলি চালায় মিলিটারীরা

ফারুকের হিসাবে, সেখানেই প্রায় আটশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যারা গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাদেরকে পরে আগুনে পোড়ানো হয়। জীবন্ত মানুষসহ অনেক ঘরে আগুন দিতে দেখেছেন। এর মধ্যে দুই একজন পুড়তে পুড়তে পালিয়ে বাংলাদেশ আসতেও পেরেছে বলে জানান তিনি।

চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে রোহিঙ্গারা, কখন আসবে খাবার

কাউয়ার বিল থেকে এসে উখিয়ায় শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন বৃদ্ধ ছালামত উল্লাহ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে নিজের ছোট ভাইকে খুন হতে দেখেছন তিনি। ছালামত উল্লাহ জানান, সেনাবাহিনী এসে তার ভাইকে ঘর থেকে বের করে গাড়ির সঙ্গে বাঁধে। গাড়ি চালিয়ে আধা কিলোমিটারের মত টেনে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে গুলি করা হয়।

সত্তরোর্ধ্ব ছালামত উল্লাহ চার ছেলে তিন মেয়ে। বৃদ্ধ এই মানুষটি তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশে আসার পথে প্রায় ১০ কি:মি পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরতে হয়েছে বলে জানান।

আশ্রয় নেওয়া নজির আহমদ বলেন, উপার্যনক্ষম বড় দুই ছেলে ও একমাত্র মেয়ের জামাইর মৃত্যু দেখেছেন নিজের চোখে। সেনাবাহিনী ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু বাপ-দাদার ভিটায় শয্যা হবে না- এ তিনি ভাবতেও পারছিলেন না।

তবে ঘরবাড়ি ছেড়ে অচেনা বাংলাদেশে আসার পথে তাকে বার বার পেছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছিল একমাত্র মেয়ের স্বামীর জন্য। নিজের মেয়ের দিকে তাকাতে পারছিলেন না তিনি। নজির আহমদ জানান, মেয়ে জামাইয়ের মৃত্যু হয়েছে জানতে পারলেও এতটা পিছুটান হয়েছিলো যে। মেয়ে তার স্বামীকে ছাড়া আসতে চাইছিল না, মেয়ে বলে বাবা আমার স্বামী বেঁচে আছে ওকে নিয়ে যাও কিন্ত এর শান্তনা কি দেব মেয়েকে?। মেয়েকে শান্তনা দেওয়ার জন্য আসার পথে কোনো একটি নিরাপদ রোহিঙ্গা গ্রাম খুঁজেছিলেন, যেখানে থেকে যাওয়া যায়। কিন্ত ১৫ দিন ঘোরাঘুরি করেও কোনো রোহিঙ্গা গ্রামকে নিরাপদ থাকতে দেখেননি এই বৃদ্ধ শেষমেষ জনস্রোতে মিশে ঢুকে পড়েন বাংলাদেশে।

নজির আহমদ বড় ছেলে আব্দুল বারীর বয়স ছিল ৩০ বছর। পাঁচ ও দুই বছরের দুটি মেয়ে আছে তার। মেজ ছেলে জোবায়েরের বয়স ছিল ২০। তারও একটি ছেলে রয়েছে। দুই ছেলের মৃত্যু ও মেয়ের জামাইয়ের শোকের সঙ্গে এখন নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত নজির আহমদ। জীবনের সব সম্পদ আর সঞ্চয় এক দিনে হারিয়ে এই বয়সে তাকে অন্য দেশে মাথা গোঁজার ঠাঁই আর খাবারের সন্ধানে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

নজির আহমদের মেজ ছেলের বউ ফাতিমা স্বামীকে মরতে দেখেছেন চোখের সামনে। সেনাবাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি করে। শোয়া থেকে স্বামীকে তিনি উঠে বসতে এবং আবার গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়তে দেখেন। পরে ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে বাংলাদেশের পথ ধরেন। কিন্ত এ মৃত্যু তার বিশ্বাস হচ্ছেনা তাই সে মনে করে তার স্বামী বেঁচে আছেন এবং ফিরে আসবেন।

বার্মা থেকে আসা আমেনা বলেন, আমার স্বামীকে ১সপ্তাহ আগে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেছে এখন সে কোথায় আছে জানিনা তবে শুনছি আমার স্বামীকে জেলে ভরে রাখছে ওরা। পাশের বাড়িতে আগুন দেখে আমার ৭বছরের শিশু সোনাকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসছি। আসার পর আমার মেয়র প্রচন্ড ঠান্ডা জ¦র লাগছে কি করমু কোথায় যামু দিশেহারা এখন। আসার পরে একদিন মাত্র কিছু ডাল ভাত খেয়েছি। মানুষজনরা যদি খাবার দেয় তবে সন্ধ্যায় খেতে পারমু।

শাহিদা বলেন, আমার স্বামীরে ওরা (সেনাবাহিনী) চোখের সামনে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করলো আর বললো তুরা এখানে থাকিস ক্যান? তুরাতো বাঙ্গালী বাংলাদেশে অনেক আগেই চলে যাবার কথা। এখন চিরতরে চলে যা। স্বামীকে হত্যা করে মিলিটারীরা আমার উপর অমানুষিক নির্যাতন করে। আর বলে তুকে না মেরে বলছি চলে যা পরে আমি ক্লান্ত শরীর নিয়ে দৌড়ে বাংলাদেশে চলে আসছি।

মো. হায়েনাত এ প্রতিবেদককে বলেন, আপনি অং সান সু চিকে লিখবেন রোহিঙ্গাদের কোন দোষ নেই। আমরা মুসলিম এটাই আমাদের অপরাধ। আমাদেরকে যেন আমাদের দেশ মিয়ানমার ফেরত নিয়ে নেন। সেখানে আমাদের সাজানো সংসার ছিলো। আমরা সেখানেই ফিরে যেতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমি দেখেছি যে যেভাবে পেরেছে পালিয়েছে। কেউ বোন ফেলে এসেছে, কেউ বাবাকে ফেলে এসেছে। বাংলাদেশে এসে কেমন আছেন? জানতে চাইলে মো. হায়েনাত বলেন শুকরিয়া।

আরআই