বারেক ল্যাংটার মাজারের খাদেম আটক; দুই বোন হত্যার নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি -মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার কাটাখালির ভিটিশীল মন্দির এলাকায় বারেক ল্যাংটার মাজারে দুই নারীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা হলেন- মাজারের নারী খাদেম আমেনা বেগম (৬০) ও তার বোন তাইজুন খাতুন (৪৫)।

বুধবার সকালে মাজারের ভিতর থেকে লাশ দুটি উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কনডম উদ্ধার করেছে। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হত্যার আগে দুই নারীকে ধর্ষণ করা হয়। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাজারের খাদেম মোহাম্মদ মাসুদ খানকে আটক করেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ধারণা হরা হচ্ছে মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময় দুই নারীকে হত্যা করা হয়। কারা, কেন এ ঘটনা ঘটিয়েছে এ ব্যাপারে এখনও কিছু জানা যায়নি। নিহতদের মধ্যে একজন মাজারের নারী খাদেম আমেনা বেগম (৬০)। আরেকজন তার আপন বোন তাইজুন খাতুন (৪৫)। তাইজুন ঢাকার বাসিন্দা। মঙ্গলবার তিনি মাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। মাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার জিকির হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসে।

মাজারের খাদেম মোহাম্মদ মাসুদ খান জানান, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে তিনি মাজার থেকে বাড়ি যান। তখন আমেনা ও তাইজুন এক কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। আজ (বুধবার) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাদের ডাকতে গিয়ে দেখি দু’জনের গলাকাটা লাশ। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিই।

তিনি আরও জানান, ‘আমেনার স্বামী বারেকের নামেই এই মাজার চলছে। আমেনা এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। আমেনা ৩০ বছর ধরে মাজারে আছেন। তার গ্রামের বাড়ি পাশের গুয়াগাছিয়া গ্রামে। আমেনার ছেলেমেয়ে আছে।

আমেনার ছেলে মো. জাবেদ জানান, তার বাবা খালেক মিজী মারা যাওয়ার পর থেকেই তার মা মাজারে খাদেম হিসাবে ছিলেন। গতকালও আমার সাথে কথা হয়েছিল মোবাইলে। কে বা কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে জানা নেই।

তাইজুনের ছেলে কফিল উদ্দিন জানান, ‘আমাদের বাড়ি সদর উপজেলার বকচর গ্রামে। তবে মা দুই ছেলের সাথে ঢাকার শ্যামপুর এলাকায় থাকতেন। মনের শান্তি পূরণের জন্য তিনি প্রায়ই এখানে আসতেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি মাজারে যান।’

মাজারের আশপাশে বাস করা লোকজন জানান, মাজারকে ঘিরে চারপাশে রীতিমতো মাদকের আড্ডা বসতো। এর মধ্যে উঠতি বয়সের লোকজনদের সংখ্যাই বেশি ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে গান বাজনার জলসা হতো।

মাজারের খাদেম মো. মাসুদ খান জানান, ‘রাতে খাদেম আমেনা বেগম এবং ভক্ত তাইজুন খাতুন মাজারের ভেতর থাকেন। সকাল এসে মাজারে ভেতরে তাদের গলাকাটা লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেই।’ মধ্যরাতে এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তিনি।

মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, জমিজমা, টাকা উত্তোলন এবং মাজারের নিয়ন্ত্রণকে এসব বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। কে বা কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাজারটি একটি টিনশেড ঘরের মধ্যে। সামনে একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। সেখানে লেখা আছে- ‘হজরত শাহ সুলেমান ল্যাংটা বাবার (পাগল) দিলু ল্যাংটার মাজার’। স্থানীয়দের কাছে এটি বারেক ল্যাংটার মাজার হিসেবে পরিচিত। সাইনবোর্ডে মাজারের খাদেম হিসেবে মাসুদ ল্যাংটার নাম উল্লেখ রয়েছে। ঘটনার পর বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্ত-অনুসারীরা এসে মাজারে জড়ো হয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর হোসনে আরা জানান, ‘মাজারের জমির মালিক স্থানীয় মাসুদ কোতোয়াল আমেনাকে মা ডাকতেন। বছর পনের আগে রাস্তার পাশের নিচু জমিতে মাটি ভরাট করে এখানে একটি ঘর তুলে শাহ সুলেমান ল্যাংটা লেখা সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়। তবে তার সম্পর্কে কিছু জানি না। এলাকাবাসীও তার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেনি। তবে প্রতি বছর এখানে বড় আকারে জিকিরের অনুষ্ঠান হয়।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে মানিব্যাগসহ কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা যাবে না। তবে খুব শিগগিরই খুনিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।