আমার সোনার পাখিকে যারা হত্যা করেছে আমি তার কঠিন বিচার চাই: রুপার মা

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: রুপার বাড়িতে এখনও শোকের মাতম চলছে। রুপার মা হাসনা হেনা বারবার জ্ঞ্যান হারাচ্ছেন আর বলছেন, ‘আমার মেয়ে বলেছিল, কোরবানির ঈদে আসবে। আর ওর আশা হল না। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব। ওর স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে বড় কিছু হবে।’

কয়েকদিন আগে রুপা মোবাইলে তার মাকে বলেছিলেন, ‘মা আর অল্পদিনের মধ্যে ফিরে আসব। সামনে কোরবানির ঈদ, তাইতো একবারে এলেই ভালো হয়। নিজের দিকে খেয়াল রাইখো। বড়ভাই আর উজ্জ্বলের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিও। তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিও। শরীরের প্রতি যত্ন নিও।’ মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে এটাই রুপার শেষ কথা।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামে নিহত রুপার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় রুপার মা হাসনা হেনার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়েকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন। এখন আমি কিভাবে বাঁচব। কেউ তো আমার সোনা মানিকের মতো আমার খবর নেবে না। রুপা তো আর আমাকে মা মা বলে ডাকবে না। আমার সোনার পাখিকে যারা হত্যা করেছে আমি তার কঠিন বিচার চাই।’

ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজে এলএলবি বিষয়ে অধ্যায়নরত ছিল রুপা। লেখাপড়ার পাশাপাশি সে শেরপুর জেলায় অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রমোশনাল ডিভিশনে চাকরি নেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে সংসার চালানোই ছিল ওর ইচ্ছা। রোজার ঈদে পরিবারের সঙ্গে হাসি-খুশিতে ঈদ করেছিল। কিন্তু গত ২৫ আগষ্ট বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে আর ফিরল না। বগুড়ার থেকে ছোয়া পরিবহনের বাসটি সন্ধ্যা ৭টার পরপর ময়মনসিংহের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। বগুড়ার বনানী এলাকা থেকে রুপাসহ আরও পাঁচ-ছয়জন যাত্রী বাসে উঠেন। সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সব যাত্রী নেমে যান। শুধু রুপা বাসে ছিলেন।

বাস এলেঙ্গা পার হওয়ার পর বাসের সহকারী শামীম রুপাকে জোর করে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। তখন রুপা মুঠোফোন এবং সঙ্গে থাকা পাঁচ হাজার টাকা শামীমকে দিয়ে অনুরোধ করেন তার কোনো ক্ষতি না করার জন্য। টাকা ও মুঠোফোন নেয়ার পরে শামীম তরুণীকে হত্যা করার ভয় দেখিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে। পরে বাসের অপর দুই সহকারী আকরাম এবং জাহাঙ্গীর পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। বাস মধুপুর উপজেলা সদরের কাছাকাছি পৌঁছলে রুপা চিৎকার করার চেষ্টা করেন। এ সময় শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর তার ঘাড় মটকে হত্যা করে। পরে মধুপুর শহর পার হয়ে বনাঞ্চলের পঁচিশ মাইল এলাকায় রুপার মরদেহ ফেলে রেখে যায়। অথচ এই রুপা বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন।

এর আগে তাড়াশ জেআই টেকনিক্যাল কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে সাফল্যের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। বাবা জেলহক প্রামাণিক এক বছর আগে মারা যান। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে রুপা চতুর্থ। বড় বোন জেসমিনের বিয়ে হয়েছে প্রায় ৭ বছর আগে। আরেক বোন পপি অনার্স পাস করেছেন। ছোট ভাই উজ্জ্বল বেকার। বড়ভাই হাফিজুর রহমান আর রুপা মিলেই সংসার চালাতেন। এ অল্প বয়সেই পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে নিয়েছিল সংসারের ঘানি। রুপা বহুবার মাকে বলেছেন, ‘আর কয়েকটা বছর অপেক্ষা কর, আমাদের সংসারে আর কোনো অভাব থাকবে না। তার মায়ের কথা ‘তাদের ফাঁসি না দিলে মাইনবো না।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে কলেজছাত্রী রূপাকে চলন্ত বাসে ছোয়া পরিবহন এর চালক,হেলপারসহ ৫জন তাকে ধর্ষণ করে। পরে ঘাড় মটকে তাঁকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ ওই রাতেই তাঁর লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা করে। পরে আদালতে নিেের্দশে ৩১ আগস্ট রূপার লাশ উত্তোলন করে তাঁর ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাঁকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

আরআই