নরসিংদীর রায়পুরা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থলুট ও ডাকাতির অভিযোগ

মো. হৃদয় খান, স্টাফ রিপোর্টার: নরসিংদীর রায়পুরা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থলুট ও ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে। মেঘনা নদীতে গরু ব্যাবসায়ীদের জিম্মি করে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা লুট করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। খেটে খাওয়া মানুষ ও দরিদ্র গরু ব্যবসায়ীদের অর্থ হাতিয়ে নেয়ায় উপজেলার ৪টি গ্রাম জুড়ে চলছে মাতম। ঋণের টাকা খোয়া যাওয়ায় সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি পরিবার। অভিযোগ উঠেছে লুট হওয়া অর্থ ফেরত চাওয়ায় গরু বেপারীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রায় ৯ লক্ষ টাকা ও ২৫টি গরু জব্দের কথা স্বীকার করেছেন রায়পুরা থানার ওসি দোলোয়ার হোসেন।

গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষ্যা ইউনিয়নের হরিপুর, দরিপুর, শুটকিকান্দা ও গোপিনাথপুরসহ চারটি গ্রামে প্রায় দুই শতাধির লোক গরু বেচা-কেনার ব্যবসা করেন। গত মঙ্গলবার সকালে চারটি গ্রামের প্রায় ষাট-পয়ষট্টি জন ব্যবসায়ী গরু নিয়ে নৌকাযোগে পার্শ্ববর্তী বি-বাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বাইশ মৌজা সাপ্তাহিক গরুর হাটে যায়। বেচাকেনা শেষে বিকেল ৫টার দিকে অবিক্রিত ২৫টি গরু ও গরু বিক্রির নগদ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। ব্যবসায়ীদের দুইটি নৌকা মেঘনা নদীর মাঝখানে পৌঁছালে রায়পুরা থানার এসআই শাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের ২০ জনের একটি দল তিনটি স্পীড বোট নিয়ে তাদের গরিরোধ করেন।

পরে অস্ত্রের মুখে ব্যবায়ীদের জিম্মি করে ফেলে। তাদেরকে তল্লাশি চালিয়ে গরু বিক্রির প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে দুই নৌকার সবাইকে থানায় নিয়ে যায়। এর মধ্যে ৪৯ জনকে নাশকতা ও বিস্ফোরণ মামলায় আটক দেখিয়ে আদালতের মধ্যেমে কারাগারে প্রেরণ করে।

৭০ লক্ষ টাকার মধ্যে আবেদ আলী বেপারীরর ১০টি গরু বিক্রির ৫ লক্ষ টাকা, বাবুল বেপারীর ২ লক্ষ ৭০ হাজার, ইসলাম উদ্দিনের ৭০ হাজার, কালু মিয়ার ১ লক্ষ ৯০ হাজার, ফেলু মিয়ার ২ লক্ষ ৬০ হাজার, করিম মিয়ার ২ লক্ষ ২০ হাজার, জলিল মিয়ার ২ লক্ষ ৪০ হাজার, কাশেস মিয়ার ১ লক্ষ ৬০ হাজার, খলিল মিয়ার ১ লক্ষ ৯০ হাজার, কাশেম মিয়ার ২ লক্ষ, শাজাহান মিয়ার ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা। বাকিরা জেলে থাকায় পরিবারের লোকজন সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেনি।

তবে পুলিশের দাবি, ৮০/৯০ জন লোক ককটেল বিস্ফোরণ করে দাঙ্গা হাঙ্গামার চেষ্টা চালাচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তেতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের আটক করে। ওই সময় তাদের কাছে থেকে ২১টি রড়ের টুকরা, ৩২টি ককটেল ও ৪৪টি টেটা জব্দ করা হয়।

গরু ব্যবাসায়ী মোঃ জাকারুল বলেন, ‘আমাদের দুইটি নৌকায় প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা ছিল। যা পুলিশ রূপী ডাকাতরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ‘ তিনি বলেন, ‘তারা পুলিশ নয়। তারা ডাকাত। পুলিশ হলে এভাবে সাধারণ জনগণের উপর অত্যাচার করতো না। ‘

গরু ব্যবসায়ী ইউসুফ বলেন, শাখওয়াত দারোগা তিনটি স্পীড বোট নিয়ে আমাদের ব্যারিকেট দেয়। নৌকায় এসেই পিস্তল ঠেকিয়ে আমাদের কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। তারা টাকাগুলো তিনটি গামছা দিয়ে বেধে একটি স্পীড বোট নিয়ে চলে যায়।

নৌকার মাঝি নিজাম ও বশির বলেন, ‘পুলিশের ভয়ে তিন বেপারীর প্রায় ৪ লক্ষ টাকা একটি ছেড়া কাথা দিয়ে নৌকার নিচে লুকিয়ে রাখি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ‘

কালু বেপারীরর স্ত্রী অরিফা বলেন, ‘ঋণ নিয়া আমার স্বামী ব্যবসা করে। পুলিশ আমার স্বামী ও ছেলের কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকা নিয়া গেছে। আবার তাদের জেলে দিছে। এখন ঋণের টাকা কেমনে শোধ করমু?’ অপর গরু ব্যবসায়ী ভুট্টো মিয়া বলেন, ‘পুলিশ যা করছে তাতে পুলিশে ডাকাতের মধ্যে প্রার্থক রইল না। ‘

থানা পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যবসায়ী ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘থানায় নেওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা টাকা ফেরৎ চাইলে মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। আর টাকা না চাইলে ছেড়ে দেয়া হবে। পরে বাধ্য হয়ে গরু বিক্রির ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছি। ‘

এদিকে এক সাথে এত ব্যবসায়ীকে আটক করে নেওয়ার পর তাদের স্বজনরা থানায় ভিড় জমায়। পরে আটককৃত কিশোর ও বয়বৃদ্ধসহ ১১ জনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত রায়পুরা থানার দারগা মোঃ শাখাওয়াত হোসেনের সাথে কথা বলতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। ওই সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে রায়পুরা থানার ওসি মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিস্ফোরণ করে দাঙ্গা হাঙ্গামার চেষ্টা চালাচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে ৪৯ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এদের মধ্যে ৮ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী, ৭/৮ জন ডিবি এসোল্টভুক্ত, ১৬ জন টেটাযোদ্ধা। ৭০ লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের কাছ থেকে ৯ লাখ ৬ হাজার ১৫০ টাকা পাওয়া গেছে যা জব্দ তালিকায় দেখানো হয়েছে। তবে দাঙ্গা হাঙ্গামা করতে গেলে কেউ এত টাকা নিয়ে যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি ওসি।