চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ফের বৈঠকে বসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ফের বৈঠকে মিলিত হচ্ছে জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদ।আগামী সপ্তাহে এ বৈঠক হতে যাচ্ছে। এক মাসের কম সময়ের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো মিলিত হচ্ছে সংস্থার ১৫ সদস্য।

বৈঠক আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এবারের বৈঠকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর চাপ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্মরণকালের ভয়াবহ এই শরণার্থী সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ওপর চাপ বাড়ছে। সমালোচনা হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের নিষ্ক্রিয়তার। আগামী সপ্তাহের এ বৈঠক দৃশ্যত তারই ফল।

এএফপি জানায়, পরিষদের স্থায়ী-অস্থায়ী ৭ সদস্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিফ করতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ইথিওপিয়া জানায়, আলোচনার দিনক্ষণ ঠিক করতে শলা-পরামর্শ চলছে।

২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নিহত হয়েছেন কয়েক হাজার। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ সংকট নিরসনে জাতিসংঘ ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে বাংলাদেশ অনেকখানি সফল হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীসহ আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই মিয়ানমারের গণহত্যার কড়া সমালোচনা করছে। পাশাপাশি, বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলো মিয়ানমারের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরছে। এসব সমালোচনা সত্ত্বেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করেনি। ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কার্যকর কিছু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে এ ইস্যুতে দু’দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে নিরাপত্তা পরিষদ। রাখাইন পরস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় আগস্টের শেষদিকে। প্রথম বৈঠকের বিষয়ে কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য দেয়া হয়নি। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে পরিষদের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর। তাতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। সমালোচনা করা হয় অভিযানের ওপর বেসামরিকদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের। ৯ বছর পর রোহিঙ্গা ইস্যুতে একমত হয় বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো।

নিরাপত্তা পরিষদের ওই বৈঠকে রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের সুরক্ষা, সামজিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করা এবং শরণার্থী সমস্যা নিরসনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরিষদের বিবৃতিতে শরণার্থীদের সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানানো হয় এবং জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোকেও এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রাখাইন পরিস্থিতির একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে একমত হয়। কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয় সেই বৈঠকে। তবে বিবৃতিতে মিয়ানমারের নিন্দা জানানো হয়নি।

এবারের বৈঠক শেষে মিয়ানমার সরকারের হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানানো হতে পারে বলে গত সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। চীন ও রাশিয়া অবশ্য এ ধরনের প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নয়। ফলে বাংলাদেশের সরাসরি এ বিষয়ে ভূমিকা পালনের সুযোগ নেই। তবে বন্ধু রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইস্যুটি নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপে সম্মত নাও হতে পারে চীন ও রাশিয়া।

নিরাপত্তা পরিষদ ছাড়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ কম। নিরাপত্তা পরিষদ অবরোধ আরোপ ছাড়াও সহিংসতা বন্ধে শান্তিরক্ষী প্রেরণ করার ক্ষমতা রাখে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সনদে মিয়ানমার সই করেনি। ফলে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যায় যুক্ত জেনারেল ও রাজনৈতিক নেতাদের ওই আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে বিচারের সুযোগ নেই। তবে নিরাপত্তা পরিষদ তাদের বিচারে আইসিসিকে সুপারিশ করলে তা হতে পারে। এ ধরনের অনেক ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে। এসব কারণেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ না থাকলে কমপক্ষে মিয়ানমারের সহিংসতার নিন্দা ও তা বন্ধের আহ্বানসহ বিবৃতি দেয়া হলেও তা মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।