বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধিতে বিইআরসির সায়

সময়ের কণ্ঠস্বর: বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বৃদ্ধিতে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রস্তাবে সায় দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। তবে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দাম গড়ে ৭২ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করলেও তা ৫৭ পয়সা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে ওই কমিটি। অর্থাৎ এ মতামত গৃহীত হলে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্যহার ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৪ টাকা ৮৭ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৪৪ পয়সায় দাঁড়াবে।

সোমবার রাজধানীতে টিসিবি মিলনায়তনে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে সংস্থাগুলোর প্রস্তাবের ওপর বিইআরসির গণশুনানিতে এ তথ্য উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা-কোম্পানিগুলো পিডিবি থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করে। তাই পাইকারি মূল্য বাড়লে খুচরা অর্থাৎ প্রান্তিক পর্যায়েও এ মূল্য বাড়বে। সেই লক্ষ্যে কোম্পানিগুলোও দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে, যেগুলোর শুনানি আজ থেকে আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। আইন অনুযায়ী, শুনানির পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিইআরসিকে দাম পুননির্ধারণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রথম দিনের শুনানিতেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বাড়াতে সরকারি সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের বিপরীতে দাম কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। শুনানিতে অংশ নিয়ে তারা পিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবকে অযৌক্তিক দাবি করে সংস্থাটির উন্নয়নে ও গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণে পরামর্শ দেন। শুনানিস্থল টিসিবি ভবনের বাইরে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধীতা করে প্রতিবাদ মিছিল, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, গণমোর্চা, বাংলাদেশ দেশপ্রেমিক পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও জোট।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা বিইআরসিতে দাখিল করে পিডিবি। অন্যান্যবার গ্রাহকশ্রেণিভেদে শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করলেও এবার টাকায় দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। পিডিবি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের খরচের ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করলেও বিইআরসি তা মূল্যায়ন করেছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের খরচের হিসাবের ভিত্তিতে।

শুনানিতে অংশ নিয়ে পিডিবি দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলে, ফার্নেস তেল ও ডিজেলের ব্যবহার বৃদ্ধি, বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুত্ কেনা এবং জ্বালানি ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয় বেড়েছে। মূল্যহারের ঘাটতি পূরণে সরকার থেকে ভর্তুকির পরিবর্তে দেয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তুলনামূলক কম মূল্যহারে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতিগুলোতে বেশী বিদ্যুত্ সরবরাহের আনুপাতিক হার বেড়ে যাওয়ায় গড় পাইকারি মূল্যহার কমে গেছে। সব মিলিয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাইকারি মূল্যহার ঘাটতির পরিমাণ প্রতি ইউনিটে (কিলোওয়াট) ৭২ পয়সায় দাঁড়ায়। ঘাটতি দূর ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে পিডিবি। বিইআরসি’র কমিটি এ ঘাটতি ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিটে ৫৭ পয়সা মূল্য বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে পিডিবি’র প্রস্তাব ও বিইআরসির মূল্যায়ন ফলাফলের সাথে দ্বিমত পোষন করে ক্যাব। সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা নানা ব্যাখ্যা ও প্রশ্ন উপস্থাপন করে বলেন, যে ঘাটতি পিডিবি দেখিয়েছে তা সরকার ও সংস্থাটির নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ভুল ও দুর্নীতির কারণে হচ্ছে। তা দূর করলে বরং বিদ্যুতের দাম কমানো যাবে।

গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান ও সাবেক বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলাম। শুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য রহমান মুরশেদ, মাহমুদউল হক ভুইয়া, আব্দুল আজিজ খান ও মিজানুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক এ কে মাহমুদ, সদস্য কামরুজ্জামান, সিপিবির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণসংহতির জুনায়েদ সাকী, সিএনজি ওনার্স এসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব হাসিন পারভেজ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত পাইকারি পর্যায়ে ৫ বার এবং খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে ৭ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিত্যব্যবহূত পণ্যটির দাম বাড়ানো হয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের আবেদনের ওপর আগামীকাল মঙ্গলবার শুনানি হবে।