মালিতে নিহত সৈনিক মনোয়ারের বরিশালের বাড়িতে শোকের মাতম

মশিউর দিপু, বরিশাল থেকে- গত রোবাবর আফ্রিকার দেশ মালিতে দায়িত্ব পালন শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে তিন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হন।

যাদের মধ্যে সৈনিক মো. মনোয়ার হোসেন (৩২) একজন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন এলাকায় হলেও তারা বর্তমানে বরিশাল নগরীর ২৮নং ওয়ার্ডের হরিপাশায় জমি কিনে সেখানে একটি টিনের ঘর তুলে আবাস গড়েছেন। আর সেখানেই থাকেন সৈয়দ মনোয়ারের মা, স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান।

বরিশাল সরকারী সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে পড়াশুনা করে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন সৈনিক মনোয়ার। কিন্তু চাকুরিতে যাওয়ার আগেই পুলিশ সদস্য বাবা রফিকুল ইসলাম ও বড়ভাই আনোয়ার হোসেনকে চিরদিনের জন্য হারান মনোয়ার। তাই অনেকটা পরিবারের হাল ধরতেই যেন তার সেনাবাহিনী যোগদান। আর আজ তাকেই হারিয়ে ফেলার বেদনায় শোকের মাতম চলছে বাড়িতে।

৭ বছরের ইলমুন ও দেড় বছরের তাসনিম নামের শিশু সন্তান দুটি বাবা হারানোর বেদনা এখনো উপলব্ধি করতে না পারলেও বাড়িতে থাকা নিহতের মা রওশন আরা বেগম আর স্ত্রী ইভা আক্তার যেন শোকে পাথর। তাদের বিলাপে যেন আশপাশের এলাকা জুড়ে শোকাচ্ছন্ন আবহ বিরাজ করছে। কোন শান্তনা তাদের আশ্বস্ত করতে পারছেনা।

নিহত সেনা সদস্যের মামা আতিকুর রহমান জানান, ছোট ভাই রবিউলের পুলিশে চাকুরি হওয়ার সুবাদে তিনি খুলনায় প্রশিক্ষনে রয়েছেন। আর সবার বড় বোন জোহরা বেগম স্বামীর সংসারেই থাকেন।

তিনি জানান, ১০ বছর আগে বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন এলাকার মো. কবির হাওলাদারের মেয়ে ইভা আক্তারকে বিয়ে করে মনোয়ার। চাকুরী নেয়ার পর ১০ বছর আগে নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর এলাকায় এক খন্ড জমি কিনে টিনের ঘর তুলে সেখানে পরিবার-পরিজন রেখে সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে চাকুরী করছিলেন মনোয়ার।

বাবা না থাকায় বৃদ্ধা মাকেও নিজের বাসায় এনে রাখেন তিনি। এরইমধ্যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে যাওয়ার সুযোগ হলে গত ৩০ মে আফ্রিকার মালিতে মিশনে অংশ নেয় মনোয়ার। মিশনের যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই স্ত্রী, সন্তান, মা সহ নিকটাত্মীয়দের নিকট ফোন করে খোঁজ খবর নিতেন মনোয়ার এমনটাই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

স্ত্রী ইভা আক্তার জানান, একবছরের জন্য শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নেয়া মনোয়ারের স্বপ্ন ছিলো সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করা। ৭ বছরের শিশু সন্তান ইলমুন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশুনা করছে। পাশাপাশি দেড় বছরের শিশু সন্তান শারিরীকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তার চিকিৎসা চলছিলো।

রোববার রাতের লঞ্চে শিশু সন্তানকে নিয়ে সেনা হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতিও নেয়া ছিলো ইভা আক্তারের। যা স্বামী মনোয়ার আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন। কিন্তু রোববার বিকেলে সেনা সদর দপ্তরের এক মুঠোফোন বার্তায় সব কিছু এলামেলো হয়ে যায় সৈনিক মনোয়ারের পরিবারের।

মনোয়ার নিহত হওয়ার খবর নিকটাত্মীয়রা প্রথমে স্ত্রী এবং তার মায়ের কাছে প্রকাশ না করলেও আত্মীয়স্বজনদের বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তায় বুঝে যান তাদের মনোয়ার আর নেই।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্থানীয়রা ২৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হুমায়ূন কবির জানান, মনোয়ার খুবই মিশুক এবং শান্ত প্রকৃতির লোক ছিলো। সে অল্পতেই মানুষের মন জয় করতে পারতো। তার মৃত্যুর খবরে বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন তারাও। সরকারের প্রতি সেনা সদস্য মনোয়ার হোসেনের লাশ দ্রুত দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবী জানিয়েছেন শ্বশুর কবির হাওলাদার।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি