নড়েচড়ে বসেছে বিএনপি, আগামীকাল সারা দেশে বিক্ষোভ

সময়ের কণ্ঠস্বর: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন ঢাকার দুইটি আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান ও ঢাকা মহানগর হাকিম নুর নবী গতকাল এ আদেশ দেন। এদিকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে বিএনপি। গতকাল রাতেই দলটির নেতারা এ প্রশ্নে করণীয় নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন।

পরিস্থিতি জানিয়ে লন্ডনেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে আগামীকাল শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো।

আলাপ করে খালেদা জিয়ার ফেরার ব্যাপারে গতকাল রাত পর্যন্ত দলটির সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মামলার অস্বাভাবিক গতির কারণে শিগগিরই তিনি দেশে ফিরছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া।

তিনি বলেন, ‘সরকার তড়িঘড়ি করে একতরফাভাবে বিএনপি নেত্রীকে সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। উদ্দেশ্য হলো, তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। তিনি জানান, লন্ডনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে চেয়ারপারসনের আজই (বৃহস্পতিবার) সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এর পরই তিনি কবে আসবেন তা আমাদের জানাবেন। ’

লন্ডন থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ২১ অক্টোবর রাত ৮টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসে খালেদা জিয়ার বুকিং রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরে এলে তাঁর সঙ্গে বৈঠকেরও কথা রয়েছে খালেদার। আর ওই বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়েও দলটির মধ্যে কাজ চলছে। যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সঙ্গেও। আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।

পর পর তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনা নিয়ে গতকাল দিনভর আলোচনা হয়েছে বিএনপির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও। বিএনপি নেতাদের কারো মতে, এটি বিএনপিকে প্রবল চাপে রাখার কৌশল। আবার কেউ বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ঠেকানোর উদ্দেশ্যই ওই পরোয়ানা; যাতে ভয়ে খালেদা জিয়া দেশে না ফেরেন। তবে পরোয়ানার আইনগত বিষয়ের চেয়ে এর রাজনৈতিক তাত্পর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দলটি। নেতাদের মতে, বেশ কয়েক মাস বিরতির পর জামায়াত ও জোট নেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরেকবার পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল; যা কার্যকর করা হয়নি। ওই সময় আদালতে গিয়ে তিনি জামিন নেন। আর জামিনে থাকাবস্থায়ই গত ১৫ জুলাই চিকিত্সার জন্য বিদেশে যান। গতকাল ওই জামিন বাতিলের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী নেতাদের মতে, এ ধরনের মামলায় শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না। শুধু রাজনৈতিক কারণে এসব করা হচ্ছে। তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আদালতে হাজির না হলে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার শেষ হওয়ার বিধান রয়েছে।

হঠাৎ করে একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনা সরকারের কঠোর অবস্থান বলেই ধরে নিয়েছে বিএনপি। আর এ ধরনের অবস্থান অব্যাহত থাকলে খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন কি না এ প্রশ্নটি দলটির সামনে গতকাল থেকে নতুন করে উঠে এসেছে। আলাপকালে দলটির নেতারা অবশ্য জানিয়েছেন, আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, চেয়ারপারসন তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিত্সা শেষে যথাসময়েই দেশে ফিরবেন। কিন্তু গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ফলে তিনি ভয়ে ফিরবেন বা ফিরবেন না এমন নয়। তাঁর মতে, সরকার আগের মতোই বিএনপিকে চাপে রেখে আরেকটি একতরফা নির্বাচনের পথ খুঁজছে। আর এ জন্যই নানা উসকানি দিচ্ছে।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আগেও হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে বিএনপি বিচলিত নয়। পরিস্থিতি আমরা আইনগতভাবে মোকাবেলা করব। ’ তাঁর মতে, সরকার ‘নার্ভাসনেস’ থেকে এখন অনেক কাজই করছে। কিন্তু বিএনপি কারো উসকানিতে না পড়ে রাজনৈতিক নিয়মেই কাজ করবে।

স্থায়ী কমিটির প্রবীণ আরেক সদস্য আইনজীবী নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার এ ঘটনা রাজনীতির খেলা। তাঁর মতে, এ ধরনের পরোয়ানার নিয়ম হলো; ফিরে এসে তিনি আদালতে গেলে আদালত আবার জামিন পুনর্বহাল করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মামলায় আদালত পরিবর্তনের জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে, যা আগামী সপ্তাহে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য খালেদা জিয়ার ফিরে আসার ব্যাপারে জানতে চাইলে মওদুদ বলেন, ‘ওই কারণে কেন! তাঁর চিকিত্সার ব্যাপার রয়েছে। তা ছাড়া আমাকে উনি জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তিনি ফিরে আসতে চান। পরোয়ানার কারণে তিনি আসবেন না এমন নয়। ’

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের মতে, সরকারই সম্ভবত চায় না খালেদা জিয়া দেশে ফিরে আসুন। কেননা, তাঁর উপস্থিতি বিএনপি তথা জনগণের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। তাঁর মতে, যে ধরনের মামলা তাতে কী হবে? কারণ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় যে দুর্নীতি বা টাকার কথা বলা হচ্ছে সেটি তো গভর্নমেন্টের টাকা না। যার টাকা সে তো কিছু বলছে না। দলের স্থায়ী কমিটি ও আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে খালেদা জিয়ার আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

গতকাল সকালে ঢাকার আলিয়া মাদরাসাসংলগ্ন মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন বাতিল করে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরেকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়। আর ৯ অক্টোবর কুমিল্লায় আরেকটি নাশকতা মামলায় পরোয়ানা নিয়ে মোট তিনটি মামলায় খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো।