প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে আব্দুর রহিম

অসীম কুমার সরকার, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি:

আব্দুর রহিম। তানোর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান। জনপ্রতিনিধি হয়েও তিনি অসম্ভব রকমের একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। কামারগাঁ ইউনিয়নের দমদমা গ্রামে তাঁর বসতবাড়ির পুরোটায় প্রকৃতির এক পাঠশালা। দু:প্রাপ্য সব ঔষধি, ফলজ ও বনজ গাছে তিনি সজ্জিত করেছেন বাড়ির চারপাশ। যা দেখে মুগ্ধ দর্শনাথীরা। এরি মধ্যে তাঁর কৃষি বাড়ী ও প্রকৃতির পাঠশালা দেখতে মোহনপুর,পবা, গোদাগাড়ী, মান্দা, নিয়মতপুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ দেখতে আসছেন। সঙ্গে বিনা মূল্যে নিয়ে যাচ্ছেন বিলুপ্ত প্রায় বিভিন্ন ঔষধি, বনজ ও ফলজ গাছ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মানুষের কাছে অভিজ্ঞতা অর্জন ও বিনোদনের এক ব্যতিক্রমী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাঁর কৃৃষিবাড়ীটি। আব্দুর রহিমের গাছের পাঠশালায় ছোট ছোট বোর্ডে লেখা রয়েছে প্রতিটি গাছের নামসহ গুণাগুণ। বিনামূল্যে বিতরণের জন্য পাঠশালার এক পাশে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ বৃক্ষ।

সরেজমিন দেখা যায়, চার শতাধিক ওষুধি, ফলজ ও বনজ বৃক্ষ দীপ্তি ছড়াচ্ছে গাছের পাঠশালায়। একই সঙ্গে এই পাঠশালায় পাশে রয়েছে প্রায় সাত বিঘা জমিতে আম, লিচু ও লেবু বাগান।

পার্শ্ববর্তী পবা উপজেলার বড়গাছীর ‘পুর্বাসা’ নারী সংগঠনের থেকে গাছের পাঠশালায় বেড়াতে আসা মনিরা খাতুন এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা বেশ কয়েক জন অনেক দিনের ইচ্ছে থেকেই গাছের পাঠশালা দেখতে এসেছি। এখানে এসে এতো গাছ দেখে মন ভরে গেছে। এখান থেকে আমাকে একটি ডাইবেটিস ও বৃন্দাবন তুলসী গাছের চারা উপহার দিয়েছেন।

ব্যতিক্রমধর্মী এই গাছের পাঠশালা গড়ে তোলা প্রসঙ্গে আব্দুর রহিম বলেন, গাছ হলো প্রকৃতির অন্যতম বন্ধু। আর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হিসেবে বেশি বেশি গাছ লাগানো দরকার। তাছাড়া গাছ দান সোয়াবের কাজ। তাই আমার এখানে যারা গাছ দেখতে আসেন তাদেরকে বিনা মূল্যে তাদের প্রয়োজনীয় গাছটি হাতে তুলে দিই। এতে আমার ভালোলাগে। এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাও অধিকাংশ গাছ চেনে না। জানে না এসবের উপকারিতা সম্পর্কেও। তাই আমি দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করে আসছি। এই চিন্তা-চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)। বিলুপ্ত প্রজাতির বৃক্ষ সংগ্রহ করাই ছিল মূল কাজ। পরে চিন্তা করলাম এসব গাছের নাম ও উপকার সম্পর্কে সবার জানা দরকার। তাই নাম দিলাম গাছের পাঠশালা। আর এখন সত্যি সত্যি পাঠশালায় পরিণত হয়েছে এটি। প্রতিদিন এখানে প্রয়োজন-অপ্রয়াজনে বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসছে।

শিক্ষার্থীদের বাস্তব ও ব্যবহারিক জ্ঞান দেয়াই গাছের পাঠশালা গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে বিভিন্ন শ্রেণিতে এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি শিক্ষা, উদ্ভিদবিদ্যাসহ এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাস্তব ও ব্যবহারিক জ্ঞান চর্চার কোনো ক্ষেত্র থাকে না। তাই গাছের পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের বাস্তব ও ব্যবহারিক জ্ঞান চর্চার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, পবা উপজেলার ‘পুর্বাশা’ নারী সংগঠন, ‘বিলনেপালপাড়া’ নারী সংগঠন ও বিয়াসের একটি প্রশিক্ষণার্থী দল গাছের পাঠশালা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

সম্প্রতি গাছের পাঠশালার উদ্যোগে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক, বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন জনসংগঠনে চার শতাধিক গাছের চারা উপহার দেয়া হয়।

আগামীতে কী পরিকল্পনা রয়েছে? জানতে চাইলে আব্দুর রহিম বলেন, আগামীতে আমার গ্রামসহ তানোরের প্রতিটি বাড়িতে যেন একটি করে ফলজ ও ঔষুধি গাছ লাগানো হয় তার ব্যবস্থা করা। যাদের গাছ লাগানো জায়গা নেই তারা অন্যের জমিতেও গাছ লাগাতে পারেন। কারণ ওই গাছ বড় হলে সে যদি মারাও যায় মানুষ তার কথা স্মরণ করবে শুধু একটি গাছ লাগানো জন্য। এর থেকে বড় সোয়াব আর কি হতে পারে।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, আব্দুর রহিম মূলত একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। আমি তাঁর ওখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তাঁর গাছের পাঠশালায় দেখেছি ঔষুধি, বনজ ও মসলা জাতীয় বেশ কিছু দুর্লভ গাছ রয়েছে। তিনি জনপ্রতিনিধি হয়েও এমন উদ্যোগ নি:সন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। তিনি প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।

ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা এই পাঠশালায় মনিরাজ, জটডুমুর, রক্তচন্দন, লালআতা, কনকচাঁপা, লালসাগর, বট,চায়না বট, বাবলা, করবী, লালজবা, টগর, কাঞ্চন, কামিনী, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, জাফরান, জামরুল, তেলাকুচ, ডুমুর, কৃষ্ণতুলসি, দুধলতা, শিয়াল কাঁটা, অনন্ত মূল, শিমুল, উলটকম্বল, সাদা ধুতুরা, জষ্ঠিমধু, ডায়াবেটিস গাছসহ ৬০প্রজাতির ওষুধি, ৫০প্রজাতির ফলজ, ১৫ প্রজাতির আম, ৪প্রজাতির কলা, ১৫প্রজাতির সবজি ও অচাষকৃত সবজি, ১৫প্রজাতির মসলা জাতীয় উদ্ভিদ, ২০প্রজাতির ফুল, ১৫প্রজাতির বনজ প্রজাতির বৃক্ষের সমাহার রয়েছে।

কামারগাঁ বনায়ন সমিতি সহ-সভাপতি রবীন্দ্র নাথ প্রামানিক জানান, আব্দুর রহিমের ৭ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন গাছের পাঠশালা নামক এই ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা ও বিনোদন কেন্দ্র। যা সমগ্র উপজেলাই শুধু নয় আশেপাশের উপজেলাতেই আব্দুর রহিমের কৃষি বাড়ি ও গাছের পাঠশালা বেশ পরিচিতি পেয়েছে।