মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে কেন অনাগ্রহ?

স্পোর্টস আপডেট ডেস্ক- বাংলাদেশে ক্রিকেট খুবই জনপ্রিয় একটি খেলা। ছেলেদের ক্রিকেটের যে কোন ম্যাচের একটি টিকেট পেতে ক্রিকেট-ভক্তদের সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার মত ঘটনা শোনা যায়।

কিছুদিন আগে সফররত অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে মমিনুল হক বাদ পড়লে ভক্ত সমালোচকদের মধ্যে তুমুল বিতর্কের চাপে পরে তাকে দলে ফেরানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে এমনটা শোনা যায় না।

মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে কেন এই অনাগ্রহ? ক্রিকেট বোর্ড, স্পন্সর এবং গণমাধ্যমগুলো থেকে পৃষ্ঠপোষকতাই বা কতটা পায় মেয়েদের ক্রিকেট দল?

সকাল সাড়ে নয়টা। বাংলাদেশে এখন চলছে মেয়েদের ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ। তারই অংশ হিসেবে ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবের মাঠে অনুশীলন করছিলেন কয়েকজন ক্রিকেটার। এদের কেউ কেউ ক্লাব পর্যায়ে নিয়মিত খেলেন।

তাদের মধ্যে একজন সুবর্না ইসলাম। তিনি বললেন, বছর জুড়ে মেয়েরা খুব অল্প ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়, যে কারণে ক্রিকেট খেলাকে এখনো পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী মেয়েদের সংখ্যা কম। “বছরে আমরা অল্প হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই। প্রিমিয়িার লিগে কয়েকটি, আর ন্যাশনাল লিগে কয়েকটি ম্যাচ। আর জেলা পর্যায়ে তো কোন ধরণের পৃষ্ঠপোষকতা পায়ই না মেয়েরা।”

এই মূহুর্তে বাংলাদেশে প্রায় বারোশো’ মেয়ে ক্রিকেট খেলছেন। এবং ক্রিকেট বোর্ড, স্পন্সর ও গণমাধ্যমগুলোর কাছ থেকে ছেলে ক্রিকেটারদের মত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কথা অনেকের মুখে শোনা গেল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলছিলেন, ছেলেরা যেখানে ন্যাশনাল লিগে ম্যাচ ফি পায় ৩৫ হাজার টাকা, একজন মেয়ে ক্রিকেটার পায় মাত্র ছয়শো টাকা। আবার বেতনের সময় জাতীয় দলে প্রথম সারির একজন পুরুষ খেলোয়াড় এখন তিন লাখ টাকা বেতন পায় মাসে। সেখানে একজন প্রথম সারির নারী ক্রিকেটারের বেতন ৩৫ হাজার টাকা।

২০০৭ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেট যাত্রা। ২০১১ সালে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশের মেয়েরা। কিন্তু বাংলাদেশে ক্রিকেট যত জনপ্রিয়, ভক্তদের যত উন্মাদনার কথা শোনা যায়, সবই ছেলে ক্রিকেটারদের ঘিরে। কেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী, যারা নিয়মিত খেলা দেখেন, তাদের বেশিরভাগ বলছিলেন, তারা মেয়েদের খেলা দেখেন না। বড় কারণ টিভিতে দেখানো হয় না।

খেলোয়াড়দের অভিযোগ, স্পন্সর আর খেলা সম্প্রচারের জন্য গণমাধ্যমগুলোও ততটা তৎপর নয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম বড় স্পন্সর ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র অপারেটিভ ডিরেক্টর উদয় হাকিম বলছিলেন, স্পন্সর করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কতটা উঠে আসবে, সেটি একটি বড় বিবেচনা তাদের জন্য।

“আমরা দেখি কোন টুর্নামেন্টের স্পন্সর হলে, সেখান থেকে আমরা কতটা মাইলেজ পাব। শেষ বার আমরা মেয়েদের একটা টুর্নামেন্ট স্পন্সর করেছি, কিন্তু সেটা টিভিতে সম্প্রচার হয়নি। ফলে আমরা সেই প্রত্যাশিত ফল পাইনি।”

বাংলাদেশে মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচগুলো টেলিভিশন ও রেডিওগুলোতে সম্প্রচার করা হয় না। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিটিভি ২০১৪ সালে ছয় বছরের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সবগুলো হোম সিরিজের সম্প্রচার সত্ত্ব কিনে নেয়, সেগুলো কেবল ছেলেদের ম্যাচ। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থপনা পরিচালক আমান আশরাফ ফায়েজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত তিনবার তারা মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচ সম্প্রচার করেছেন।

কিন্তু মেয়েদের খেলার মান, তাদের খেলাকে আকর্ষনীয় করে তোলা এবং বিনিয়োগ উঠিয়ে আনা—অর্থাৎ যেসব বিষয়ে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে, তার পেছনে ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি’র কি ভূমিকা রয়েছে? পারিশ্রমিকে বৈষম্যের ব্যপারেই বা কি কর্তৃপক্ষ?

বিসিবির নারী উইং এর চেয়ারম্যান এমএ আওয়াল চৌধুরি বলেন, “আমরা আস্তে আস্তে এগোচ্ছি। তাদের ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং আরো তৃনমূল থেকে খেলোয়াড় খুঁজে আনার বিভিন্ন পরিকল্পনা আমাদের আছে। “আর তাদের পারিশ্রমিকও বাড়ানো হবে।”

তবে, এই পরিস্থিতিতেও আশাবাদী মিডিয়াম ফাস্ট বোলার এবং ব্যাটসম্যান জাহানারা আলম, যিনি এই মূহুর্তে মেয়েদের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কও। তিনি বলছেন, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাদের খেলার উদ্দীপনা বাড়বে।

তিনি বলেন, “ধরেন, একটা ম্যাচে আমি শূণ্য রানে আউট হলাম, আমাকে এখন বড়জোড় বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু সেই ম্যাচ যদি টিভি দেখায়, তাহলে আমাকে লক্ষ কোটি দর্শর্কের কাছে জবাবদিহি করতে হয় নিশব্দে। ফলে সেটা ভালো খেলারও প্রেরণা দেয়।”

কর্তৃপক্ষ এবং যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ছেলেদের ক্রিকেটকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য অবদান রেখেছেন, তারা একইভাবে মেয়েদের ক্রিকেটকেও জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বিবিসি

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি