যেভাবে নিজের মা-বাবাকে নৃশংস কায়দায় নিজ হাতে খুন করেন ঐশী

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক: আদালতের এক রায়ের পর আজ আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে বহুল আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তাঁদের মেয়ে ঐশী রহমান। ‘জোড়া খুনের অপরাধকে মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য’ বললেও পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিহত পুলিশ দম্পতির মেয়ে এই মেয়েকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে রেহাই দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাঁচটি যুক্তি দেখিয়ে সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে দিয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এদিকে ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পরের দিন ১৭ আগস্ট নিহত মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই মো. মশিউর রহমান রুবেল পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। একই দিন পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করেন ঐশী রহমান।

এর পরই নির্মম এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। প্রশ্ন উঠে কিভাবে ১৪ বছরের একজন কিশোরী তার বাবা-মাকে হত্যা করে?

ঘটনাটি ২০১৩ সালের। তখন সবার মুখে মুখে ছিল ঘটনাটি। সবার মুখে একটাই নাম। ঐশী। নিজের মা-বাবাকে নিজ হাতে খুন করেন ঐশী। কফির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে ঘুমের ঘোরে তাদের ছুরি দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে হত্যা করেন তিনি। আদালতে তিনি এই রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনাও দেন।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগে নিজের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পরদিন ঐশী গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করেন।

সে সময় গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী জানিয়েছিলেন, এক বন্ধু উচ্চমাত্রার ঘুমের ট্যাবলেট এনে দেয় ঐশীকে। ঐশী ট্যাবলেটগুলো কফির সঙ্গে মিশিয়ে তার বাবা বাবা-মাকে পান করান। বাবা-মা দুজনই কফি পানে অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর ঐশী হত্যা করেন তার বাবা-মাকে। মা-বাবাকে হত্যার পর ঐশী গোসলও করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী বলেন, প্রথমে তিনি মাকে হত্যা করেন। হত্যার পর তার লাশ লুকিয়ে রাখেন। মাকে হত্যার সময়ে বাবা বাইরে ছিল। বাবা ঘরে আসার পর তাকেও চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে হত্যা করেন তিনি। টুকরো করার জন্য বাসায় ধারালো অস্ত্র না পাওয়ায় লাশ টুকরো করতে পারেননি। ঐশী মেঝের রক্ত মুছে গোসলও করেন।

২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট আদালত সূত্র জানায়, ‘ঐশী জানিয়েছে গত ১৪ আগস্ট আমি ছয় পাতা ঘুমের বড়ি কিনেছিলাম। রাত ১১টার পর তিন পাতা বাবার কফিতে মিশিয়ে পান করাই। আর মায়ের কফিতে তিন পাতা মেশাই। কফি পান করার পর তারা ঘুমিয়ে পড়েন। পরে আমি চাকু দিয়ে বাবাকে স্ট্যাব করি। এরপর বাবা মারা যান। বাবাকে হত্যার পর আমি হুইস্কি পান করি। বাবাকে হত্যার পর একইভাবে মাকে চাকু দিয়ে স্ট্যাব করতে থাকি। এক পর্যায়ে মা গোঙাতে থাকেন। এরপর মা আমার কাছে পানি চান। আমি তাকে পানি খাওয়াই। এরপরও মা যখন মারা যাচ্ছিলেন না তখন মায়ের গলায় চাকু দিয়ে স্ট্যাব করতে থাকি। পরে মা মারা যান। বাবা-মাকে হত্যার পর কাজের মেয়ে সুমিকে ডাকি। দুজনে লাশ টেনে বাথরুমে রাখি। পরে কৌশলে ছোট ভাইকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাই।’

আদালতে ঐশী আরও জানান, মা স্বপ্না রহমানকে হত্যার পর বটি দিয়ে চাবির গোছা কেটে চাবি নেন তিনি। এর পর লকারের তালা খুলে নগদ প্রায় লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে সকালে কাজের মেয়ে সুমি, ছোট ভাই ঐহীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। হত্যার পর দেশের বাইরে চলে যাওয়ারও পরিকল্পনা করেন ঐশী।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৮ম শ্রেণি থেকেই ঐশী মাদক গ্রহণ শুরু করে ক্রমেই বিপথগামী হতে থাকে। পরে তার মাদক গ্রহণ ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। বাবা-মা চেষ্টা করে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। যে কারণে বাব-মার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় তার। এ কারণেই হত্যার পরিকল্পনা করে।

সূত্র জানায়, ঐশী সব ধরনের মাদকেই আসক্ত ছিল। হেরোইন, প্যাথেডিন ইঞ্জেকশন, ইয়াবা, অ্যালকোহল এমনকি গাঁজা সেবনেও অভ্যস্ততা ছিল তার। এসব কারণেই প্রতিমাসে নতুন নতুন কৌশলে বাবা-মাকে বলে হাত খরচ হিসেবে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন ঐশী। তবে বিভিন্ন সময় আদালতে মা-বাবাকে খুনের কথা অস্বীকার করেন ঐশী। এ বছরের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনালে লিখিত বক্তব্যে ঐশী আদালতকে জানান, ঘটনার সময় তিনি অন্য স্থানে ছিলেন। সেখানে তিনি মদ পান করছিলেন। ঘটনা জানার পর তিনি পুলিশের কাছে যান।

সেসময় ঐশী আদালতকে আরো বলেন, তাকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বড় বড় লাঠি দিয়ে তাকে বেদম মারধর করে। মা-বাবাকে হত্যার কথা স্বীকার করতে বলে। স্বীকার না করলে তাকে আবারও রিমান্ডে নেওয়ার ভয় দেখায় পুলিশ। পরে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এদিকে বিভিন্ন সময় ঐশীর বয়স নিয়েও বিভ্রান্তি ও বিতর্ক ওঠে। তবে সে সময় বয়স নির্ণয়ের বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা বলেছিলেন, ঐশীর বয়স ১৮ বছরের বেশি।

অপরদিকে আজ রবিবার রায় প্রদানকারী হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের স্বাক্ষরের পর আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। গত ৫ জুন আলোচিত এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিল শুনানি করে হাইকোর্টের ওই দ্বৈত বেঞ্চ ঐশী রহমানের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে দণ্ড কমানোর ব্যাখ্যায় আদালত বলেন, পাঁচটি কারণে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। এগুলো হলো:

১. হত্যাকাণ্ডের সময় ঐশী মাদকাসক্ত ছিলেন এবং ১৪ বছর বয়স থেকেই তিনি সিসা, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের মতো নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতেন।

২. ঐশী বংশগতভাবে মানসিক রোগী। তাঁর চাচা-দাদি-খালা অনেকের মধ্যেই মানসিক রোগের লক্ষণ আছে, যা তাঁর মধ্যেও ছোটবেলা থেকে বিদ্যমান।

৩. হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দ্বিতীয় দিনের মাথায় ঐশী আত্মসমর্পণ করেছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

৪. ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৯ বছর। এ বয়সের একটি সন্তানকে তাঁর বাবা-মা যথাযথভাবে দেখভাল করেননি। ফলে ঐশী ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।

৫. ঐশীর বাবা-মা দুজনেই সন্তানের লালনপালন বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি স্নেহবঞ্চিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে ঐশীকে রেহাই দেওয়ার ৫টি কারণ উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এবং মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণেই। এ আসামি অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত’।

এর আগে ঢাকার ২০১৫ সালে ঐশী রহমানকে দুবার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। মামলার অন্য আসামি ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে খুনের ঘটনার পর ঐশীদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে দু’বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও একমাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঐশীর অন্য বন্ধু আসাদুজ্জামান জনি খালাস পান। চার আসামির অন্যজন গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার। সুমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার চলছে শিশু আদালতে।

ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ এ রায় ঘোষণা করেন। এছাড়া প্রত্যেক মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে ঐশীকে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, অনাদায়ে দুই বছর কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর অন্যটি সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছর কারাদণ্ডাদেশ ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। মামলার অপর আসামি আসাদুজ্জামান জনিকে খালাস দেন আদালত।

২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ঐশী রহমান রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। এর আগে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ ঐশীকে প্রধান আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের।

রায়ে বলা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এটি হিসেবে তাদের জন্য ভালো পরিবেশ ও সময় দেওয়া প্রয়োজন। তার বাবা পুলিশে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত এবং জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্ধি করছিলেন, ঠিক সে সময় তার জীবন আসক্তিতে ও উচ্ছন্নে চলে গেছে।

বিচারিক আদালতে ঐশীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিষয়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘নিম্ন আদালত সামাজিক অবক্ষয় বিবেচনায় নিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে এ রায় দিয়েছেন। কারণ, একটি মেয়ে তার বাবা-মাকে নিজের হাতে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সাজা নির্ধারণ ও বিচারের ক্ষেত্রে এ ধরনের আবেগ প্রদর্শনের সুযোগ নেই। আদালত আইনগত তথ্যাদি ও প্রমাণাদি বিবেচনায় নেবেন। যেখানে একজন নারী হিসেবে ১৯ বছর বয়সে এ ধরনের অপরাধ করেছেন’।

হাইকোর্ট বলেন, মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটি কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে, তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বা সাহায্য করে। এছাড়া আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড কমানোর কোনো গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিক্ষার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়’।