লতিফ সিদ্দিকীর আসনে জনপ্রিয়তায় অনেকটা এগিয়ে সোহেল হাজারী

অন্তু দাস হৃদয়, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি- বর্তমান ক্ষমতাশীল দল আওয়ামী লীগের এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা ও টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারের সন্তান আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী আমেরিকায় টাঙ্গাইল সমিতির সংবর্ধনা সভায় বেফাঁস কথা বলে সাংসদ পদ ও মন্ত্রিত্ব হারানোর পর থেকেই রাজনীতির এক রকম আড়ালেই চলে গেছেন।

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) নির্বাচনী আসনে প্রায় নিয়মিত জয়লাভ করা এই জনপ্রিয় নেতার অনুপস্থিতিতে সে খানে এখন তার স্থান দখল করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের অনেকেই সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর নৌকা প্রতীকের জন্য মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তবে, ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তায় অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান সাংসদ হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রধান দল বিএনপি থেকে মনোনয়ন-দৌড়ে অনেকে মাঠে নামলেও স্পষ্ট এগিয়ে থাকার মতো কোনো নেতাকে এখনো আলাদা করে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না বলে জানা গিয়েছে।

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) উপজেলার দুটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদের শাহ্জাহান সিরাজকে হারিয়ে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।

এরপর থেকে গত দশটি সংসদ নির্বাচনের ছয়টিতে বিজয়ী হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তা ছাড়াও একবার সাংসদ নির্বাচিত হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সহধর্মীনি লায়লা সিদ্দিকী।

২০০১ সালের নির্বাচন ছাড়া গত ২৬ বছরে এ আসনটি ছিল সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর শাসনে। সর্বশেষ গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে বিজয় হওয়ার পর আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার সদস্য পদের দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু গত ২০১২ সালের (২৮ সেপ্টেম্বর) আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী আমেরিকার পালকি কমিউনিটি সেন্টারে টাঙ্গাইল সমিতির সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার-পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, হজ, তাবলিগ ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করে রোষানলে পড়ে যান দল ও সাধারণ মানুষের কাছে। এই পরিণতি থেকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার ও ছাড়তে হয় মন্ত্রিত্ব।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এর মধ্য দিয়ে মন্ত্রিত্ব শূন্য হয় টাঙ্গাইল-৪ আসন। দীর্ঘ আট মাস মন্ত্রীশূন্য থাকার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করেন এ্যাডভোকেট তারানা হালিম।

মন্ত্রীর শূন্যতা পূরণ হলেও টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) শূন্য আসনের উপ-নির্বাচন হতে সময় লেগে যায় প্রায় দীর্ঘ ১৪ মাস। প্রথমে এর দিন ধার্য ছিল ওই বছরের ২৮ অক্টোবর। আইনি জটিলতায় পড়ে ওই আসনের নির্বাচনের দিন ধার্য হয় ১০ নভেম্বর। উপ-নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) এর মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় মামলায় গড়ালে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়।

বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর করা রিট চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খারিজ করে দিলে উপ-নির্বাচনের বাধা কাটে। প্রায় ১৪ মাস পর চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হওয়ার পর চোখে পড়ার মতো বড় কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে না পারলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলে-মিশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর আসনটি ধীরে-ধীরে সোহেল হাজারীর আওতায় চলে যায়। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নের ক্ষেত্রে সবার আগে নাম শোনা যাচ্ছে হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারীর।

এদিকে টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের বর্তমান সাংসদ সোহেল হাজারী সপ্তাহের ৫-৬ দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এলাকায় জনসংযোগ করেন। সময়ে-সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন ও তাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এখন হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারীর।

এদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মাঠে রয়েছেন যারা-

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো দৃঢ় সাংগঠনিক দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করতেন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তার অনুপস্থিতিতে দলের সর্বেসর্বা এখন কালিহাতী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু। তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানাগিয়েছে।

এ ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী, এফবিসিসিআইর পরিচালক আবু নাসের গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। যদি লতিফ সিদ্দিকী না চান তা হলে তার স্ত্রী সাবেক সাংসদ বেগম লায়লা সিদ্দিকী মনোনয়ন চাইবেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

বিএনপি মনোনয়ন পেতে মাঠে রয়েছেন যারা-

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন-দৌড়ে এ পর্যন্ত আট জনের নাম শোনা যাচ্ছে যারা দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন। তাদের অনেকে বেশ আগে থেকে এলাকায় গনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

টাঙ্গাইল-৪ আসনে বিএনপির শক্ত প্রার্থী হতে পারতেন স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাহ্জাহান সিরাজ। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় শাহ্জাহান সিরাজের স্ত্রী বেগম রাবেয়া সিরাজ ও তার ছেলে রাজিব আহমেদ (অপু সিরাজ) মনোনয়ন চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়াও কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন, মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান বাদল, সাবেক ছাত্রনেতা বেনজীর আহমেদ টিটু, এলেঙ্গা পৌর মেয়র মো.শাফি খান, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হালিম, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এস এম এ খালিদ দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, সাংসদ ছিলেন যারা বিগত দিনের-

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদের শাহ্জাহান সিরাজকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী প্রথম বারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন।

১৯৭৯ সালে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী বেগম লায়লা সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে জাসদের শাহ্জাহান সিরাজের কাছে হেরে যান।

১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম লায়লা সিদ্দিকী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জাসদের শাহ্জাহান সিরাজকে পরাজিত করে প্রথম বারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন।

১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন জাসদের শাহ্জাহান সিরাজ।

১৯৯০ সালে শাহ্জাহান সিরাজ জাসদ ছেড়ে দিয়ে পরে বিএনপিতে যোগদান করেন।

এরপর, ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাহ্জাহান সিরাজ ও আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী একে অপরের মোকাবেলা করেন।

১৯৯১, ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৬ (১২ জুন) আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও ২০০১ সালে শাহ্জাহান সিরাজ নির্বাচিত হন।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী জয়ী হন। ২০১৪ সালে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী সাংসদ হওয়ার পর তাকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়।

টাঙ্গাইল জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে, টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৩২ জন ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬০ জন। তবে, হালনাগাদের মাধ্যমে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা বাড়তে পারে।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি