চুক্তি সই হওয়ার ৩ সপ্তাহের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়া হবে রোহিঙ্গাদের: সু চি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চুক্তি সই হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে রাখাইনের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মায়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি।

সোমবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের ৩১তম সম্মেলনের এক প্লেনারি অধিবেশনে এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

খবর ম্যানিলা বুলেটিন ও সিএনএন ফিলিপাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রুদ্ধদ্বার এই অধিবেশন শেষে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সু চির দেয়া ওই প্রতিশ্রুতির কথা জানান ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র হ্যারি রোক জুনিয়র।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পক্ষ থেকে অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি উত্থাপন করা হয়। এরপর মায়ানমারের তরফে বলা হয়, আনান কমিশনের প্রস্তাব তারা মেনে চলছে। তবে সন্ত্রাসবাদ দমন ও রাখাইনে শান্তি ফিরিয়ে আনতেই সেনা অভিযান চালনো হয় বলেও জানায় মায়ানমার।

এর আগে সু চির সরকার জানায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিতে আপত্তি নেই মায়ানমারের। তবে কারা দেশটিতে ফিরতে পারবে সে বিষয়ে কড়া শর্ত চাপিয়েছে।

মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি ইউ কিইয়াও জেয়া শুক্রবার জানান, দেশের স্টেট কাউন্সিলার অং সান সু চি গত ১২ অক্টোবর এ নিয়ে তার দেশের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। পুনর্বাসন এবং উন্নয়নের কাজও শুরু হচ্ছে।

কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনা হবে চারটি শর্ত সাপেক্ষে। যাঁরা সেই শর্ত পূরণ করতে পারবেন, শুধু তাদেরই ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

শর্তগুলো হচ্ছে:

প্রথমত, রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে দীর্ঘদিন বসবাসের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত যারা স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরতে চাইবেন। তৃতীয়ত পরিবারের কেউ মায়ানমারে রয়েছেন তেমন প্রমাণ দেখাতে হবে এবং ঘ. বাংলাদেশে কোনো বাচ্চা জন্মালে তার বাবা-মা দুজনকেই মায়ানমারের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং এর প্রমাণ দিতে হবে।

এই চার শর্ত যেসব রোহিঙ্গা পূরণ করতে পারবে কেবল তারাই মায়ানমারে ফেরত যাওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু সু চির এই শর্তগুলো যতটা অবাস্তব ততটাই অগ্রহণযোগ্য।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে যারা দেশ ছেড়েছেন, তাদের কাছে কী করে এই সব তথ্য-প্রমাণ থাকবে? এর জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি বলেন, ‘স্কুলে পড়া, হাসপাতালে চিকিৎসা, চাকরির নথি এ সবের মতো কিছু প্রমাণ তো দেখাতেই হবে। না হলে ফেরত নেওয়াটা মুশকিল। এবং এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।’

গত শুক্রবার ইয়াঙ্গুনে ‘ভারত-মায়ানমার সম্পর্কের আগামী দিন’ বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ কূটনীতিক। কলকাতার ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ, ইয়াঙ্গুনের ভারতীয় দূতাবাস এবং মিয়ানমার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞরাও যোগ দিয়েছেন এই সম্মেলনে।

কিন্তু শরণার্থী সমস্যার মতো মানবিক বিষয়ে মায়ানমার সরকার কেন এত কড়া শর্ত চাপাচ্ছে? জানতে চাইলে ওই কূটনীতিক বলেন, রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা কেবলমাত্র মানবিক বিষয় নয়। নিরাপত্তাও একটা বড় কারণ।

মানবিকতার খাতিরে ক্ষমতায় এসেই সু চি কফি আনান কমিশন তৈরি করেছেন। রাখাইনে পুর্নবাসন-উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছেন। এ সবও তো সরকারই করেছে। সম্মেলনে অংশ নেয়া ভারতীয় প্রতিনিধিরাও মায়ানমার এই কূটনীতিকের সুরে সুর মেলান। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং)-এর সদ্য প্রাক্তন প্রধান রাজেন্দ্র খান্না মনে করেন, রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে চলবে না।

খান্না জানান, ২০০৪ সাল থেকে আইএসআই রাখাইনে সক্রিয়। তার অভিযোগ, পাকিস্তানি মদতেই মোহাম্মদ ইউনুস ‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন’তৈরি করেন। পরে মুজাম্মিল এবং রাহিল নামে দুই লস্কর কমান্ডারকে আইএসআই বাংলাদেশ হয়ে রাখাইনে পাঠিয়েছিল। আন্দোলনকারীদের তারাই জঙ্গিপনার প্রশিক্ষণ দেয়। আইএসআই-এর মদতেই পরবর্তী কালে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ বা আরসা-র জন্ম হয়। এই অঞ্চলে উগ্রপন্থা বাড়লে ভারত-মায়ানমার উভয়েরই সমস্যা হবে বলে মনে করেন প্রাক্তন ‘র’-প্রধান।

একই মত ইয়াঙ্গুনে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম মিস্রির। তিনি বলেন, উন্নয়ন ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে দিল্লি বিপুল টাকা ঢালছে। কিন্তু সীমান্তে শান্তি না-থাকলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন। দুই ভারতীয় কর্মকর্তার সূত্র ধরে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ বলেন, ‘মোরে-তামু সড়ক পথে বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার জন্য শান্তিই হল প্রথম শর্ত।’

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের কি হবে, কে নেবে তাদের দায়িত্ব? এ নিয়ে অবশ্য কোনো বক্তব্য নেই ভারত ও মিয়ানমারের। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যা নিয়েও তাই বুঝি নীরব নয়াদিল্লি।