সমঝোতার পরও যে কারণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে না

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- প্রায় দশলাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করছেন৷ তাঁদের ফিরিয়ে নেয়ার তৎপরতা কথা শোনা যাচ্ছে৷ কিন্তু সেটা আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

প্রশ্ন উঠেছে, নির্যাতন–নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও ঠিক কী কারণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে না?

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক স্তরে যে তৎপরতা চলছে তাতে এখন পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যুতে জোরালো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি৷ বরং পশ্চিমা নেতারা বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে যতটা উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন, মিয়ানমারে গিয়ে বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাদের গলা ততটাই নরম হয়ে যায়৷

এমন পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা সংকটের আশু সমাধান আশা করছেন না অনেকেই৷ মিয়ানমার কিছুদিন আগে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতেও আশা দেখছেন না অনেকে৷ বরং নাগরিকত্ব ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট কিছু না থাকায় এভাবে ফিরে যেতে অনীহা দেখেছিলেন অনেক রোহিঙ্গা৷ তাঁরা মনে করেন, নিজের দেশে ক্যাম্পে থাকার চেয়ে বাংলাদেশের ক্যাম্প অনেক ভালো৷

কক্সবাজারের সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, আগামী দু’মাসে রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে এমন আশা করার যৌক্তিকতা খুবই কম৷ তাই এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকেই মনোযোগ দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি৷ সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়ার মতো উদ্যোগের পক্ষে তিনি৷ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে যেতে পারে বলে মত তাঁর৷

আনুষ্ঠানিকভাবে অবশ্য বাংলাদেশ এখনো শরণার্থী ইস্যুতে ইতিবাচক অবস্থানেই আছে৷ দেশ, বিদেশ থেকে সহায়তা আসছে প্রচুর৷ হঠাৎ করে ছয় লাখের বেশি শরণার্থী আসার ধকল সামাল দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী৷ বর্তমান সরকারও আন্তর্জাতিক সমাজে পাচ্ছে বাড়তি গুরুত্ব৷ কিন্তু এখন প্রশ্ন চলমান এই সংকট কি দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে?

এদিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার যে চুক্তি হয়েছে তাতে এই সংকটের কোনো সমাধান দেখছেন না বিশ্লেষকরা৷ এটাকে মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন তাঁরা৷

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওই চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর ও এ বছরের ২৫ আগস্টের পরে মিয়ানমার থেকে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার৷ দুই মাসের মধ্যে ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা৷ কিন্তু কতদিনের মধ্যে ফেরত নেয়া হবে তা চুক্তিতে বলা নেই৷ মিয়ানমারের ফেরত নেয়ার পর প্রথমে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় কেন্ত্রে রাখা হবে৷ আর সম্মতিপত্রে সই করা হয়েছে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের চুক্তির আলোকে৷

মিয়ানমার ঐ সম্মতিপত্র মেনে নিলে বাংলাদেশ থেকে তারা সাত লাখের মত রোহিঙ্গা ফেরত নেবে৷ কিন্তু বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে ১০ লাখেরও বেশি৷ ২০১৬ সালের আগে আসা তিন লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার কোনো কথা চুক্তিতে নেই৷ এছাড়া দিনে কত জন ফেরত নেয়া হবে আর কতদিনের মধ্যে ফেরত নেয়া হবে তার কোনো সময়সীমার উল্লেখ নেই এতে৷

এদিকে বাংলাদেশ চায় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেবে। তবে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ে থাকা মানুষ আসলেই মিয়ানমারে নাগরিক কি-না তা যাচাই করে ফিরিয়ে নিতে চায় দেশটি।

অন্যদিকে জাতিসংঘ চায়, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে রোহিঙ্গা ফেরাতে হবে। এমনকি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো পরিস্থিতি নেই বলেও অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ।

ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে কীভাবে মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়টি পরিবর্তন করেছে। অথচ সু চির সরকারের দাবি, বৈধ প্রমাণ দেখাতে পারলে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।

১৯৮৯ সালের ওই আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি। ফলে হাজার বছর ধরে রাখাইনে থেকেও রোহিঙ্গারা সেখানে অবৈধ হয়ে যায়।

এমনকি বেশিরভাগ রোহিঙ্গার কাছে সরকারি কোনো নথিপত্রও নেই। বাড়িঘরে আগুন লাগার মধ্যেই অনেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছেন। সেই সময় পরিবারের বৃদ্ধ লোক, ছেলে মেয়েকে নিয়ে পালানোর বাইরে কাগজপত্র নেয়ার মতো পরিস্থিতি তাদের ছিল না।

অন্যদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, গরু-ছাগল, ফসল নিয়েছে বৌদ্ধরা। একেবারে শ্মশান হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো। সে কারণে রোহিঙ্গাদের ফেরানো হলে তারা নিজেদের গ্রামে যেতে পারবে নাকি অন্য কোথাও তাদের রাখা হবে সেটাও পরিষ্কার নয়। সুত্র- ডি ডব্লিউ, নিউইয়র্ক টাইমস

রবিউল ইসলাম (রবি)