পুলিশি অভিযানের পরও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মাদকের ভয়াবহ মরণনেশা থেমে নেই!

মো: ইমাম উদ্দিন সুমন, স্টাফ রিপোর্টার : অব্যাহত পুলিশি অভিযানের পরও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মরন নেশা মাদক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিন দিন বেড়েই চলছে মাদক বিক্রেতার সংখ্যা । মাদকের এ ভয়াবহতায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে অভিভাবক মহল। কিন্তু মাদক নির্মূলে কার্যকর কোন পথও খুঁজে পাচ্ছেনা তারা । ফলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। দেশের প্রচলিত নোংরা রাজনীতির কারনেই উঠতি বয়সী যুবসমাজ নিজেদের সপে দিচ্ছে মাদকের অন্ধকার জগতে। এমনই অভিযোগ অনেক অভিভাবকের। অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের হাতে আটক হলেও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে তারা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, চলতি বছর প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে বসুরহাট পৌরসভা, সিরাজপুর, চরপার্বতী, চরহাজারী, চরকাঁকড়া, রামপুর, মুছাপুর ও চরএলাহী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে উল্লেখ্যযোগ্য পরিমান মাদক। ফলে সাময়িকভাবে কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসলেও নির্মূল হয়নি মাদক। আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঐ মাদক ব্যবসায়ীরা পূণরায় জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়। উপজেলার এক পৌরসভা ও ৮ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অবাদে বিক্রি হচ্ছে মাদক। প্রতিদিন বাড়ছে মাদক সেবীর সংখ্যা। মাদক বিক্রেতাদের ইন্ধনদাতা হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতার যোগসাজোশ রয়েছে বলেও অনুসসন্ধানে জানা গেছে। জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া মাদক সেবী ও বিক্রেতাদের কারনে কোম্পানীগঞ্জের সচেতন অভিভাবকরা তাদের সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মাদক সেবীর পাশাপাশি দিন দিন বাড়ছে মাদক বিক্রেতার সংখ্যাও।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর পুলিশি অভিযানে কোম্পানীগঞ্জ থানা ১শ ১৯জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে । পাশাপাশি উদ্ধার করেছে ১৮শ ৬৬ পিচ ইয়াবা, ৭ কেজি গাঁজা,৯৮ টি ফেনসিডিল, ১শ ৪ বোতল বিদেশী মদ ও ৩৪ লিটার বাংলা মদ। এ সংক্রান্তে কোম্পানীগঞ্জ থানায় ৭৫ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশি তথ্যমতে কোম্পানীগঞ্জে মাদক বিক্রেতা হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৮৬ জনের একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছে । পরবর্তীতে বড় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে এ ৮৬ জনের মধ্য থেকে ৪০ জনের একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছে । তালিকাভূক্ত ঐ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে বসুরহাট পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের দিদার, ২নং ওয়ার্ডের মো: সবুজ, আনোয়ার হোসেন জিলানী ও চৌধুরী, ৩নং ওয়ার্ডের আবু তাহের, ৪নং ওয়ার্ডের আবুল খায়ের, মিজান ওরফে জামাই মিজান, রসুল আমিন, মরনী বেগম, আলমগীর, ফারভীন আক্তার, নূর আলম, রবিউল আউয়াল, মো: হানিফ ও সেলিম, ৫নং ওয়ার্ডের আনোয়ার হোসেন, মাসুদ ওরফে সবুজ, রুবেল, আবুল কালাম ও মো: মিজান, ৬নং ওয়ার্ডের আবুল হোসেন ওরফে বাহার ও জাকের হোসেন, ৭নং ওয়ার্ডের সোহেল ও সোহাগ ।

সিরাজপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড মোহাম্মদ নগরের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে মো: ইউনুছ ওরফে টিপু ।

চরপার্বতী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের জাকির হোসেন সেলিম ও মো: কাউছার রবিন, ১নং ওয়ার্ডের জামাল উদ্দিন, ও মো: জসিম, ৭নং ওয়ার্ডেল মো: মহিন উদ্দিন ও হাসেম ওরফে হাসিমা ডাকাত, ৫নং ওয়ার্ডের মো: আজাদ ওরফে ফরাজী আজাদ ও সাইফুল ইসলাম।

চরহাজারী ইউনিয়নের মো: হারুন মিয়া, মো: আইয়ুব আলী, রফিক উল্যা ওরফে রবু, রফিকুল ইসলাম ওরফে রোব্বা ও জাহানারা বেগম ।

চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মৃত লেদু মিয়ার ছেলে ওবায়দল হক ।

রামপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সাইদুর রহমান বাবুল ও মাঈনুদ্দিন ওরফে বাদশা অন্যতম।

এদের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। তালিকার বাইরেও অনেক মাদক বিক্রেতা রয়েছে, যাদের নাম এখনো তালিকায় উঠে আসেনি। তাদেরকে মাদকসহ গ্রেফতার করার পরই তাদের বিরুদ্ধে মামলা রজু হলে তারপর তালিকায় নাম উঠবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অনেক সময় মাদক বিক্রেতাকে পুলিশ আটক করলেও রাজনৈতিক নেতাদের হন্তক্ষেপে তারা থানা থেকে ছাড়া পেয়ে যেতেও দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রনহীন মাদকের ছোবলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ও উঠতি বয়সের যুবকেরা। এসব নেশার ফলে যুবকেরা হয়ে যাচ্ছে কর্মহীন, বাড়ছে অলসতা। অপরদিকে নেশার টাকা যোগাতে এদের অনেকেই পা বাড়াচ্ছে অপরাধ জগতে। ফলে সম্ভাবনাময় জীবন হয়ে যাচ্ছে অভিশপ্ত।

এদিকে পুলিশ মাদক নিয়ন্ত্রনে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও কিছুতেই যেন হার মানছে না মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারনও খুঁজে পাওয়া গেছে। নতুন নতুন ব্যবসায়ী হিসেবে যারা নিজেকে এ তালিকায় নিয়ে এসেছে তাদের অনেকেই প্রথমে নেশা করত। নেশার টাকা যোগাড় করতেই তারা পরবর্তীতে নিজেই ব্যবসায়ীর তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ফলে মাদক ব্যবসায় নতুন নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলার অভিভাবক মহলের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতংক। এই পরিবেশে ছেলেদের আগলে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে এক অভিভাবক জানান ।

বিষয়টি নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সৈয়দ মো: ফজলে রাব্বির সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, কোম্পানীগঞ্জে মাদক নির্মূলে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী আটক ও মাদক উদ্ধারে আমাদের চেষ্টার কোন কমতি নেই এবং আমার থানার কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে অনেক মুন্সিয়ানাও দেখিয়েছে। কোম্পানীগঞ্জে মাদক নির্মূল হওয়া পর্যন্ত পুলিশের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।