মাদারীপুরের সদর হাসপাতাল চলছে নানা অনিয়মে! চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

মেহেদী হাসান সোহাগ, মাদারীপুর: মাদারীপুর সদর হাসাপাতালে কর্মচারী-কর্মকর্তা, ডাক্তার অফিস শুরুর ২ ঘন্টা পরও দেখা পায় না দুর-দুরান্তের রোগীরা। অসহায় হয়ে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। জরুরী বিভাগে কয়েকজন বসে থাকলেও নেই ডাক্তার। নেই সেবা। নেই পরিস্কার- পরিচ্ছন্ন কর্মিরা। সেবার মান নিয়েও রয়েছে রোগীদের বিভিন্ন অভিযোগ। হাসপাতালে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি থাকলেও ডিজিটালের কথা বলে পাঠানো হয় প্রাইভেট হাসাপাতালে এবং রয়েছে হাসপাতালে বিভিন্ন অব্যবস্থপনা। নেই সঠিক নজরধারী। অনুসান্ধানে ডেস্ক থাকলেও নেই কেউ ফাকা ডেস্ক বসে আছে হাসপাতালে এক পাশে। এই নিয়ে ধারাবাহিক কয়েক পর্বের আজ প্রথম পর্ব-১

সদর হাসপাতালে একদিন সকাল ৮টা আগেই উপস্থিত হলাম। হাসপাতালে নেই তেমন কোন কর্মচারী শুরু হয় নাই পরিস্কারের কাজ। তবে ৮টা বাজার কিছুক্ষন পরই দেখা গেল জরুরি বিভাগে দুইজন কর্মচারী বসে আছে। এছাড়া মাদারীপুর সদর হাসপাতালের প্রধান গেট খোলা থাকলেও ভর্তি রোগীদের আত্মীয় স্বজন ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায়না। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট তখন অজয় নামের একজন পরিচ্ছন্নকর্মীকে ঝাড়– দিতে দেখা যায়। ৯টায় হাসপাতালের বহিঃবিভাগের মহিলা কাউন্টারে টিকিট বিক্রির জন্য একজন ও পুরুষ কাউন্টারে টিকিট বিক্রির জন্য ৯টা ২০ মিনিটে আসে একজন মহিলা। ইতিমধ্যে রোগীদের লাইনও বড় হয়ে যায়।

হাসপাতালের বহিঃবিভাগের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৯টা ২২ মিনিটে দন্ত চিকিৎসক ডা. আশরাফুল আলম খান রোগী দেখছেন।

এছাড়া পাশের রুমে অর্থপেডিক্স ডাক্তার বায়েজিদ মোস্তফা, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. হাসান্জ্জুামান, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল ইসলাম খানের রুমে তালা দেখা যায়। এসময় দুর দুরান্ত থেকে রোগীদের ভীর বাড়তে দেখা যায়।

মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি গ্রাম থেকে আসা ৭৫ বছরের বৃদ্ধা সামান বান জানান, আমি অনেক কষ্ট করে চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছি। কিন্তু ডাক্তার নেই। ডাক্তার নাকি অপারেশন করছে। তাকে আজ পাওয়া যাবে না। তাই চলে যাচ্ছি।

মাদারীপুর সদর উপজেলার হোগলপাতিয়া গ্রামের মো. মোবারক হোসেন বলেন, আমিও চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছি। কিন্তু ডাক্তার নেই। তাই চলে যাচ্ছি। যদি আগে থেকে জানতাম অপারেশনের জন্য ডাক্তার পাওয়া যাবে না, তাহলে আমরা আজ আসতাম না। ক্ষোভের সাথে আরো রোগী ও রোগীর সাথে আসা প্রায় ৭/৮ জন জানালেন এসব কথা।
খোজ নিয়ে জানা যায়, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. হাসান্জ্জুামান ১৫ জন রোগীর চোখ অপারেশন করাবেন। তাই আজ রোগী দেখবেন না। দুপুর ২টা পর্যন্তও তার দেখা মেলেনি। তিনি অপারেশনের রুমে ছিলেন বলে জানা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, নারিকেল গাছ থেকে পড়ে হাতে ব্যাথা পেয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার পাচখোলা গ্রামের শাহা উদ্দিন মাতুব্বরের ছেলে মো. শিপন সকাল ৯টায় এসেছেন অর্থপেডিক্স ডাক্তার দেখানোর জন্য। তখন সারে ১০টা বাজলেও ডাক্তারের দেখা মেলেনি। তিনি বলেন, ডাক্তার কখন আসবেন জানিনা। ব্যাথায় কষ্ট হচ্ছে।

রাজৈর উপজেলার সাধুর ব্রীজের মাচচর গ্রাম থেকে এসেছেন রাজিয়া সুলতানা। তিনি তার ৩ মাস বয়সের মেয়েকে নিয়ে এসেছেন অর্থপেডিক্স ডাক্তার দেখানোর জন্য। শিশুটির পায়ের চিকিৎসার জন্য। এসময় দেখা যায়, শিশুর এক আত্মীয় শিশুর পা থেকে ব্লড দিয়ে কেটে ব্যান্ডিস খুলছে।

ব্যান্ডিস খোলার ব্যাপারে রোগীর পরিবারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, আসলে ডাক্তার তো ব্যান্ডিস খোলে না। তাছাড়া জরুরি বিভাগে ভীর থাকে। গতবারও আমরাই খুলেছি। এবারও তাই খুলছি। ডাক্তার এখনও আসেনি তাই কাজটি এগিয়ে রাখছি।

পরে খোজ নিয়ে দেখা যায়, ডাক্তার ১১টার পর এসেছিলেন। কিছুক্ষণ রোগী দেখে আবার চলে যান। এব্যাপারে দুপুর দেড়টার দিকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. শশাংক চন্দ্র ঘোষের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থপেডিক্সের ডা. বায়জিদ মোস্তফা আজ এসেছেন এবং রোগীও দেখেছেন। বর্তমানে তিনি অপারেশনের রুমে আসেন।

এদিকে হাসপাতালের শিশু রোগীদের ভীর থাকলেও ডাক্তারের দেখা মেলেনি। কালকিনি উপজেলার ভূরঘাটা থেকে ইতি বেগম ১৭ মাস বয়সের শিশু ইউসুফকে নিয়ে সকাল ৮টায় এসে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বসে থেকেও ডাক্তারকে পাননি। শিশুটি খাট থেকে পড়ে মাথায় ব্যাথা পেয়ে বমি করছে। এ সময় শিশুটির মা কেদে কেদে বলেন, ডাক্তার এখনও আসেনি। কি করবো বুঝতে পারছিনা।

শিবচর উপজেলার শেখপুর থেকে ঠান্ডা সমস্যা নিয়ে আসা শিশু সায়মার মা শান্তা বেগম বলেন, ডাক্তার আসেনি। অনেক দুর থেকে এসেছি। কাল আবার আসা সম্ভব না। অপেক্ষা করে করে দুপুর সারে ১২টার দিকে প্রায় ৭/৮ জন মা তার শিশু সন্তানদের নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার দাস বলেন, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল ইসলাম খান ওয়ার্ডে রোগী দেখার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ডায়বেটিস বেড়ে গেছে। তাই সে ছুটি নিয়েছে। তবে আর যারা তাদের প্রায় সকলকেই আমি হাসপাতালে যাওয়ার পর মনে হয় দেখেছি।
মাদারীপুর সদর হাসপাতাল- পর্ব-১