খুলনায় শশুড়বাড়ির লোকজনের আগুনে প্রাণ গেলো জাহিদের

মেহেদী হাসান, খুলনা থেকে: শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর কাছে জ্যাকেট ও কোট দিতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গিয়েছিলেন স্বামী জাহিদ হোসেন (২৮) নামে এক ব্যক্তি। ওই বাড়িতে থাকা অবস্থায় তাকে পেছন থেকে কেউ বোতলে থাকা দাহ্য পদার্থ ছুঁড়ে মেরে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনই বক্তব্য জাহিদের। শরীরের অধিকাংশ স্থান পুড়ে গেলেও সবার সামনেই তিনি অভিযোগ করেন কেউ তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। অবস্থা খুবই আশংকাজনক হাওয়ায় তাকে ঢাকা বার্ন ইউনিটে রেফার্ড করা হয়েছে। রবিবার ঢাকা বার্ন ইউনিটে আইসিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃর্তু্ হয়।

এ ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য জাহিদের স্ত্রী রুম্মান খুমেক হাসপাতালে ভর্তির সময় জরুরি বিভাগে বলেন, তার স্বামী গ্যাস সিলিন্ডারে ব্লাস্ট হয়ে আগুনে পুড়ে যান। তার হাতেও আগুনে পুড়ে যায় বলে দাবি স্ত্রীর। এ ঘটনায় রুম্মানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হেফাজতে প্রিজন সেলে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর বাগমারা বাই সোবহান লেন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রার ডাঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন বলেন, কোন ধার্য্য পদার্থের সাহায্যে জাহিদের শরীর আগুনে পুড়ে গেছে। শতকরা ৮০ ভাগই উপরে আগুনে শরীর ঝলসে গেছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতে ঢাকা বার্ন ইউনিটে রেফার্ড করা হয়েছে। সে জীবন-মৃত্যু সন্ধিক্ষনে আছেন।

খুলনা থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, জাহিদ শ্বশুর বাড়ি থেকে দেয়া বেলাজার ফেরত দিতে গেছিল। ওই সময় তার স্ত্রী উর্ম্মে রুম্মান ঘরে একাই ছিল। তখন তাদের দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। উর্ম্মে ভাষ্য মতে, ওই সময় জাহিদ রাগান্বিত হয়ে বোতলে কেরোসিন নিজের গায়ে দিয়ে নিজেই আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় আগুন নিভাতে গিয়ে উর্ম্মে রুম্মানের হাত পুড়ে যায়। এদিকে জাহিদের ভাষ্য হচ্ছে, সে নিজের শরীরে আগুন ধরায়নি। পেছন থেকে তার পিঠের ওপর একটি বোতল ছুড়ে মারে, তারপরে তার শরীরে আগুন ধরে যায়। এরপর সে আর কিছু বলতে পারেনা। পেছন থেকে কে ছুড়ে মারলো তা তিনি দেখতে পাননি। উর্ম্মে রুম্মান হাসপাতালে চিকিৎসাধীনা আছেন, তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে হাসপাতালে প্রিজনসেলে রাখা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নগরীর বাগমারা বাইলেনের বাসিন্দা হারুণ অর রশীদের মেয়ে উম্মে রুম্মান এর সাথে নিরালা কাশেম সড়কের বাসিন্দা মৃত তাহেরের পুত্র জাহিদ হোসেনের সাথে সাড়ে চার বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। পরে জাহিদ কর্মস্থল বিদেশে গেলে ফোনে পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি হয়। পরে জাহিদ গত দেড় মাস আগে দেশে ফিরে এলে স্ত্রী উম্মে রুম্মান তাকে ডিভোর্স দেয়। তবে জাহিদ ডিভোর্স গ্রহণ না করে সামাজিকভাবে পুনঃবিবাহের মাধ্যমে আবারও ঘর সংসার শুরু করে। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় গত ৬ ডিসেম্বর নতুন করে আবারও ডিভোর্স পাঠায় তার স্ত্রী। গত শনিবার রাতে শ্বশুর বাড়ি যায় জাহিদ। পরে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তার স্ত্রী জাহিদকে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়েছিল।

অনুসন্ধানে রোববার দুপুরে জাহিদ হোসেনের বাসার এলাকা নগরীর ২নং কাশেমনগরে গেলে জাহিদ ও উম্মে রুম্মানের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ওই এলাকার বাসিন্দা মৃত তাহের আহমেদ এর পুত্র জাহিদ হোসেনের সাথে ডাঃ মাওঃ হারুন অর রশিদের কন্যা উম্মে রুম্মানের পারিবারিকভাবে ২০১৩ সালে ৮ মার্চ বিয়ে হয়। জাহিদ ৪ ভাই বোনের মধ্যে মেঝ। বিয়ের আগে থেকেই বিদেশে (বাহারাইন) থাকতো। তার মায়ের পছন্দে উম্মেকে বিয়ে করেন। সে খুব ভদ্র ছিলো। মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতো। যখন বিদেশ থেকে আসে তার কয়েকদিন পর বিয়ে হয়। ওই সময় দুইজনের সংসার বেশ ভালই চলছিল। ওখান থেকে চলে আসার পরবর্তীতে সে সৌদীতে যায়। চলতি বছরে রোজার ঈদের দুইদিন আগে দেশে আসে। ওই সময় কোন কারণ ছাড়াই উম্মে রুম্মান প্রথম জাহিদকে ডিভোর্স লেটার পাঠান। তখন বিচার শালিসের মাধ্যমে সমাঝোতা হয়ে আবার বিয়ে হয়। বিদেশ থেকে জাহিদ বউয়ের জন্য ৫-৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কার বানিয়ে আনে। এছাড়া বউয়ের নামে কয়েকটি ডিপোজিট করে দেয়। যখন যা চাইতো সেই আবদার জাহিদ পূরণ করতো। জাহিদের নামে ডিপোজিটও বউয়ের নামে নমিনী করা আছে। গত ৩ মাস আগে জাহিদ সৌদী থেকে তার স্ত্রী উম্মে রুম্মানকে ফোন দিলে তেমন একটা কথা বলতো না, ফোন ধরতো না। তখন উম্মে রুম্মান রোজার ঈদের পর থেকে তার বাপের বাড়িতে বসবাস করতো। ওইখানে জাহিদ তার ভরনপোষণসহ যাবতীয় আবদার পূরণ করতো। হঠাৎ জাহিদের স্ত্রীর আচার আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করে। বিদেশ থেকে ফোন দিলে সে ঠিকমত ফোন রিসিভ করতো না। সৌদী থেকে আসার পর স্ত্রীকে দেখতে শ্বশুরবাড়িতে গেলে তার স্ত্রী বাসায় নেই বাইরে গেছে বলে জাহিদকে বিদায় করে দিতেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। গত ৬ ডিসেম্বর মেয়ের ডিভোর্সের আগেও আরও একবার মেয়ের ডিভোর্স হয়। তখন আবার সমঝোতায় দুইজনে পুনরায় বিয়ে করেন। একাধিক সূত্র মতে, জাহিদ সৌদী থাকায় অবস্থায় তার স্ত্রী উম্মে রুম্মান বাপের বাড়িতে থাকায় সে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকেই জাহিদকে সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।