আকায়েদের আইএস কানেকশন খুঁজতে বেরিয়ে এল বঞ্চনার তথ্য

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম: নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে বাস টার্মিনালের বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে আটক বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহর (২৭) পরিবারের কাউকে খোঁজে পায়নি পুলিশ।
তবে আকায়েদ উল্লাহর পরিবার সম্পর্কে জানতে তার চাচাতো ভাই সোহরাব হেসেন ও খালু তুষাণ কোম্পানীকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম।

আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বশেষ তথ্যে ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, চাচাতো ভাই সোহরাব হোসেন আকায়েদ উল্লাহ পরিবারের তেমন কোন তথ্য দিতে না পারলেও খালু তুষাণ কোম্পানী শুনিয়েছেন আকায়েদ উল্লাহর বাবা মৃত সানাউল্লাহর পারিবারিক নানা বঞ্চনার কথা।

খালু তুষাণ কোম্পানী জানান, আকায়েদ উল্লাহর চাচাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে তার বাবা মৃত সানাউল্লাহ বিয়ের আগেই ঘরবাড়ি ত্যাগ করে ঢাকার হাজারীবাগে চলে যান। ওই এলাকায় তিনি একটি মুদির দোকানের ব্যবসা করতেন। সে প্রায় ৩০-৩২ বছর আগের কথা। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন।
হাজারীবাগে থাকা অবস্থায় সন্দ্বীপ উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের গাছুয়া থেকে বিয়ে করেন সানাউল্লাহ। এরপর স্ত্রীর বড় ভাই সবুর মিয়া সানাউল্লাহকে আমেরিকায় নিয়ে যান। ২০১০ সালে দিকে সানাউল্লাহ সেখানে মারা যান। পরে ২০১১ সালে আকায়েদ উল্লাহ আমেরিকায় নিয়ে যান। আকায়েদরা চারভাই বোন। সে সবার বড়। এরপর তারা মা ও ভাইবোনদেরও আমেরিকায় নিয়ে যান আকায়েদ।

সন্দ্বীপের মুসাপুর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি থাকলেও চাচাদের নির্যাতনে রাগে-ক্ষোভে তারা আর সেদিকে থাকায়নি। এমনকি চাচাতো ভাইবোনদের সাথে তেমন কোন সম্পর্কও রাখেনি। বর্তমানে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি ভোগ করছে চাচাতো ভাই বোনরা।

তাদের পৈত্রিক ভিটার উপর চাচাতো ভাইরা পাকা বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে। আকায়েদ ও তার ভাই-বোনরা এ ভিটায় আর কোনো ঘরবাড়িও করেনি। আমেরিকা থেকে ফিরলে তারা ঢাকার হাজারীবাগেই থাকেন। যদিও আতœীয় স্বজনদের দেখার জন্য তারা মাঝেমধ্যে সন্দ্বীপে আসেন।

তার চাচাতো ভাই সোহরাব হোসেন বলেন, সম্পত্তি বিরোধ নিয়ে আকায়েদ উল্লাহ পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক কম ছিল। তবে যোগাযোগ ছিল। মাঝে-মধ্যে তারা গ্রামে আসেন। আকায়েদ চাঁদপুর থেকে বিয়ে করেছেন। তিন মাস আগে তার একটি ছেলে সন্তান হয়েছে। সর্বশেষ ওই সময় সে বাংলাদেশে এসেছিল।

এর আগে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে বাস টার্মিনালের বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে আটক আকায়েদ উল্লাহর বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে মুসাপুর ইউনিয়নে ৮নং ওয়ার্ডের হায়াত উল্লাহর বাড়িতে জানার পর তার সম্পর্কে জানতে পুলিশ সেখানে যাই।

কিন্তু সেখানে আকায়েদ উল্লাহর পরিবারের কাউকে খোঁজে পায়নি বলে জানান ওসি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, শেষে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে সন্দ্বীপের গাছুয়া থেকে তার খালু তুষান কোম্পানীকে থানায় ডেকে নিয়ে এসে আকায়েদ উল্লাহর পরিবার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
পরে বিকেলে থানায় এসে পৌছেন তার চাচাতো ভাই সোহরাব হোসেন। তিনিও আকায়েদ উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্য ঢাকার হাজারীবাগে থাকার কারনে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেনি।

চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা এ প্রসঙ্গে বলেন, আকায়েদ উল্লাহর খোঁজ খবর নিতে আমরা তার খালু চাচাতো ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই তারা জানাতে পারেনি। আরও কয়েকজনের সাথে কথা বলে আমরা আকায়েদ ও তার পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে সন্দ্বীপ উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের নাদিম বলেন, আকায়েদ উল্লাহ ২০ বছর বয়স পর্যন্ত দেশে থাকলেও এলাকায় না থাকায় সে খুব পরিচিত নয়। তবে সে ধার্মিক ছিল। কোন সময় কোন অপরাধে লিপ্ত ছিল বলে আমার জানা নেই।

তিনি বলেন, আকায়েদের পরিবারের কেউ এখন সন্দ্বীপ থাকে না। পুলিশ তাদের কাউকে খোঁজে না পেয়ে তার খালু তুষান কোম্পানীকে ধরে নিয়ে যায়। তার খালুর বাড়ি সন্দ্বীপের গাছুয়ায়। তার নানা বাড়িও তাদের বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে।

প্রসঙ্গত, নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ কমিশনার জেমস ওনেইল এর বরাত দিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আকায়েদ উল্লাহর শরীরে বিস্ফোরক ডিভাইস সংযুক্ত ছিল। বোমাটি আকায়েদের শরীরে বিস্ফোরণ হওয়ায় সে নিজেসহ আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। তাদের ম্যানহাটনের বেলেভ্যু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে বেলেভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আকায়েদ উল্লাহ ও তার মা, ভাই, বোনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে আকায়েদ উল্লাহ অনেক তথ্য দিয়েছে। বলেছে, অনলাইনেই সে শিখেছে বোমা বা বিস্ফোরক কিভাবে বানাতে হয়। এরপর এক সপ্তাহ আগে সে পাইপ বোমা বানায়।

আকায়েদ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে স্থায়ী মার্কিন অধিবাসী হিসেবে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাস শুরু করেন। আকায়েদ ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করতো। ২০১২ মার্চ থেকে ২০১৫ মার্চ পর্যন্ত তার নামে ট্যাক্সির লাইসেন্স করা ছিল।