বাউফলে বিদ্যালয়ের জমি বেদখল: জমির অভাবে দেড় কোটি টাকার ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাতিল!

কৃষ্ণ কর্মকার, বাউফল প্রতিনিধি: বিদ্যালয়ের নামে সাড়ে ৫৪ শতাংশ জমি। কক্ষ সংকটের কারণে একটি নতুন ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ জমির অভাবে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ওই নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করার পরেও ওই ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আর ওই ভবন নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মাঠে বিশাল আকৃতির গর্তের সৃষ্টি হয়। যা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এ কারণে দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর্যন্ত মাঠ ব্যবহার করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয়ের জমি বেদখল হওয়ার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের ধাউরাভাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। প্রধান শিক্ষকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বগা ইউনিয়নের ধাউরাভাঙা মৌজার ২১২ নম্বর খতিয়ানের ৪০১ ও ৪০২ নম্বর দাগের সাড়ে ৫৪ শতাংশ জমির মালিক বিদ্যালয়টি। ১৯৩৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫০। শিক্ষক কর্মরত আছেন ৬ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, বিদ্যালয়ের জমি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির স্বজনেরা দখল করে ভোগ করছেন। এ কারণে দ্বিতল ভবন পেয়েও নির্মাণ করা যায়নি। তারা দ্যিালয়ের জমি উদ্ধারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে শ্রেণি কক্ষ সংকটের কারণে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (পিইডিপি-৩) আওতায় ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পান মো. শফিকুল ইসলাম নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ বলেন,২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বেইজ কাটার পরে ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদার। এ কারণে দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর্যন্ত চরম ভোগান্তিতে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ওই কাজের দায়িত্বে ছিলেন মো. নিপু। তিনি বলেন, যে জমিতে ভবন নির্মাণের কথা। ওই জমি বেদখল, সেখানে বসতবাড়ি। পরবর্তীতে বিদ্যালয় ব্যবস্থা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কথা বলে সমঝোতার ভিত্তিতে বর্তমান ভবনের সামনেই নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেয়। সে অনুযায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। নির্মাণ সামগ্রী কাজের সাইডে নেওয়া হয়। পরে তারাই (ব্যবস্থাপনা কমিটি) আবার নির্মাণ কাজে বাধা দিয়ে পুকুরের মধ্যে ভবন নির্মাণের জন্য বলেন। যা অসম্ভব। এ কারণে ওই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে তার প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন,‘ভবনটি নির্মাণের জন্য আমিসহ ইউএনও মহোদয় অনেক চেষ্টা করেছি। জমি দিতে না পারায় ভবন নির্মাণের কাজ বাতিল করা হয়েছে।’

ইউএনও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ আল মাহমুদ জামান সত্যতা স্বীকার করে বলেন,‘খুবই দুঃখজনক। মানুষ উন্নয়নে বাধা দেয়। এটা আমার জানা ছিল না।’
গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠে বিশাল আকৃতির গর্ত। যা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। বিদ্যালয়ের এক তলা ববনের বারান্দায় রয়েছে টিনের বেড়া। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুরা ওই গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে এমন আশঙ্কায় ওই টিনের বেড়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাড়ে ৫৪ শতাংশ জমির মাত্র ২০ শতাংশ জমি দখলে আছে বিদ্যালয়টির। তাও দখলদারদের সঙ্গে মৌখিক এওয়াজ বদলের মাধ্যমে। এর ওপর বিদ্যালয়টির দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি এক তলা ভবন নির্মিত। কক্ষ সংকটের কারণে পাঠদান বিঘিœত হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমান ভবনটির অবস্থা খুবই নাজুক। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সভাপতি মো. মতিউর রহমান জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ের জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার কোনো স্বজন দখল করেননি।’ তিনি আরও বলেন, ঠিকাদার বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের মধ্যে ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। এ কারণে স্থানীয় লোকজন এতে বাধা দেয় এবং তারা মাঠের পাশে ডোবার মধ্যে ভবন নির্মাণ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তা না করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত সুলতানা বলেন,‘নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় তারা সবাই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু মাটি খোঁড়াখুঁড়ির করার পর নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সবাই হতাশ।’

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ইকরামুল বলে,বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ কারণে বৃষ্টির সময় ক্লাশ করতে খুবই কষ্ট হয়। আমরা নতুন ভবন চাই।’ পঞ্চম শ্রেণির মারুফ বলে,‘খেলার মাঠে গর্ত ও পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে এক বছর পর্যন্ত খেলাধূলা করতে পারি না। আমরা খেলাধূলা করার উপযোগী মাঠ চাই।’

সমাজকর্মী মো. মাসুদ বলেন,‘শিগগির বিদ্যালয়ের জমি উদ্ধার করে কক্ষ সংকট দূরীকরণের জন্য নতুন ভবন ও মাঠকে খেলার উপযোগী করে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশে ফিরিয়ে আনা হোক।’